• বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ন

অতি উৎপাদন ও জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ: মার্কিন শুল্ক নীতির নতুন ফাঁদে বাংলাদেশ?

Reporter Name / ৬৩ Time View
Update : রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬

বৈশ্বিক বাণিজ্যে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে এবং দেশীয় বাজার সুরক্ষায় নতুন কৌশল হাতে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ‘অতিরিক্ত উৎপাদন’ এবং ‘জোরপূর্বক শ্রম’-এর অভিযোগ তুলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর)। এই তদন্তে অন্যায্য বাণিজ্য বা জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের প্রমাণ মিললে মার্কিন বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার অধীনে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর শাস্তিমূলক আমদানি কর আরোপ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইউএসটিআর প্রধান জ্যামিয়েসন গ্রির। আগামী জুলাই মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত অস্থায়ী শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এই তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের নামও রয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই তদন্তের পেছনে আইনি ও কৌশলগত ভিন্ন উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে। সম্প্রতি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘পাল্টা শুল্ক’ বা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপের নির্বাহী আদেশ বাতিল করে দেওয়ায় বিকল্প পথে শুল্ক বসানোর ফন্দি খুঁজছে প্রশাসন। নির্বাচনপূর্ব সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে বাংলাদেশের স্বাক্ষরিত এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) চুক্তিটিও এখনো কার্যকর হয়নি। তাই সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সরাসরি শুল্ক আরোপের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অতি উৎপাদন সক্ষমতা ও জোরপূর্বক শ্রমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে নতুন করে কর আরোপের আইনি বৈধতা পাওয়ার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের সাথে তাদের প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা।

এই তদন্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আবুল খায়ের এবং সিপিডি’র সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক চাহিদার কথা মাথায় রেখেই শিল্পোদ্যোক্তারা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে থাকেন, তাই এখানে ‘অতি উৎপাদন’-এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন। অন্যদিকে, নব্বইয়ের দশকেই শিশুশ্রম নিষিদ্ধ করা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে নতুন করে জোরপূর্বক শ্রমের তদন্তের বিষয়টিও বেশ বিস্ময়কর। মূলত ভর্তুকি বা সস্তা শ্রম ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমিয়ে রাখার অযুহাত দেখিয়ে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই এমন অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক পদক্ষেপে বাংলাদেশ সরকার আপাতত কোনো বড় ধরনের ঝুঁকি দেখছে না। বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য চাইলে নিয়ম মেনেই তার জবাব দেওয়া হবে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আগামী ১৭ই মার্চের মধ্যে এই বিষয়ে লিখিত জবাব দাখিল করতে হবে এবং মে মাসের প্রথম সপ্তাহে এর শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। তাই আট বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের এই বাজারে নিজেদের স্বার্থ ও বিশাল রপ্তানি খাতকে সুরক্ষিত রাখতে এখন থেকেই আলোচনার টেবিলে শক্তিশালী ও কার্যকর কূটনৈতিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।

খবরের মূল বিষয় সংক্ষিপ্ত বিবরণ
তদন্তের বিষয়বস্তু অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা (১৬টি দেশ) এবং জোরপূর্বক শ্রমের ব্যবহার (৬০টি দেশ), যার উভয় তালিকাতেই বাংলাদেশ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গোপন লক্ষ্য সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্পের ‘পাল্টা শুল্ক’ নীতি বাতিল হওয়ায়, বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারায় বিকল্প উপায়ে নতুন শুল্ক আরোপের সুযোগ তৈরি করা।
বিশেষজ্ঞদের মত মুক্তবাজারে ‘অতি উৎপাদন’-এর দাবি অবাস্তব। পোশাক খাতে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগও বিস্ময়কর। এটি মূলত মার্কিন বাজার রক্ষার কৌশল।
বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপট দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানিই ৬ বিলিয়ন, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় বাণিজ্য ঘাটতি।
পরবর্তী পদক্ষেপ আগামী ১৭ই মার্চের মধ্যে বাংলাদেশকে লিখিত জবাব দিতে হবে এবং মে মাসের প্রথম সপ্তাহে এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category