• বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৪ অপরাহ্ন

আইন অমান্য করে চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বাণিজ্য

Reporter Name / ১ Time View
Update : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

দেশের ওষুধের বাজারে এক নীরব কিন্তু অত্যন্ত ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী বাণিজ্যের বিস্তার ঘটছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত গ্রামীণ জনপদের সাধারণ ফার্মেসি, ওষুধের পাইকারি গুদাম, এমনকি জীবন রক্ষাকারী কিছু হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারেও অহরহ মিলছে মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিষিদ্ধ ওষুধ। গত ছয় মাসে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় পরিচালিত যৌথ অভিযানে নিয়মিতভাবে বিপুল পরিমাণ মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদনহীন ওষুধ উদ্ধার, লাখ লাখ টাকা জরিমানা ও ফৌজদারি মামলা হওয়ার ঘটনা সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, এটি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়। বরং এই মরণফাঁদ দেশের পুরো ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে উদ্বেগজনক ও আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে এ ধরনের ভেজাল ও মেয়াদ পার হওয়া ওষুধের ধারাবাহিক উপস্থিতি মূলত সরকারি তদারকি ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা এবং ওষুধ ব্যবস্থাপনার গভীর সংকটেরই স্পষ্ট প্রতিফলন। দেশে আইন ও শাস্তির কঠোর বিধান থাকলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে চরম শিথিলতার সুযোগেই এই চক্র ডালপালা মেলছে।

দেশের প্রচলিত ‘ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩’ অনুযায়ী, যেকোনো ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ উৎপাদন, বিক্রি কিংবা সাধারণ প্রদর্শনের অপরাধে ন্যূনতম এক বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানার সুস্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। তবে ভেজাল ও নকল ওষুধ বিক্রি এবং প্রদর্শনের ক্ষেত্রে অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার কঠোর আইনি নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে মাঠ পর্যায়ে এই কঠোর আইনের বাস্তব প্রয়োগ নেই বললেই চলে। নিয়মিত তদারকির চরম ঘাটতি, অবিক্রীত বা মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া ওষুধ কোম্পানি কর্তৃক ফেরত নেওয়ার অকার্যকর ও জটিল ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলার সুযোগেই গড়ে উঠেছে এই শক্তিশালী অবৈধ সরবরাহচক্র। এর ফলে প্রতিদিনই অজান্তে লাখ লাখ সাধারণ রোগীর প্রেসক্রিপশনের সাথে পৌঁছে যাচ্ছে বিষাক্ত ও কার্যকারিতাহীন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, যা রোগ সারানোর বদলে উল্টো শরীরে মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদান তৈরি করছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ শুধু তার রোগ নিরাময়ের মূল কার্যকারিতাই হারায় না, বরং রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলে রোগীর শরীরে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও বিষক্রিয়া ঘটাতে পারে। এ ধরনের নিম্নমানের ওষুধ সেবনের ফলে মানবশরীরে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হওয়া, স্থায়ী অঙ্গহানি ঘটা এবং সরাসরি মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এই অবহেলার চড়া মূল্য দিতে হয়েছে দুটি নিষ্পাপ শিশুকে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাজধানীর সবুজবাগে বমির সিরাপ খাওয়ানোর পর ১৬ মাস বয়সী শিশু নাদিয়া খাতুনের আকস্মিক মৃত্যু হয়, যার সিরাপটির মেয়াদ ২০২৩ সালেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। একই বছরের অক্টোবরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত চার বছর বয়সী শিশু আয়েশা মণি এক কথিত চিকিৎসকের দেওয়া সম্পূর্ণ মেয়াদোত্তীর্ণ আয়ুর্বেদিক সিরাপ সেবনের পরপরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এই দুই নির্মম ও হৃদয়বিদারক ঘটনা প্রমাণ করে যে, তদারকির অভাব ও অসাধু ব্যবসায়ীদের অন্ধ লোভ কিভাবে এখন শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি মনজিল মোরসেদ এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ভেজাল ওষুধ যেহেতু সরাসরি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে, তাই এই জঘন্য অপরাধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে সর্বোচ্চ ও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান ভ্রাম্যমাণ আদালতগুলো গুরুতর এই জীবননাশী অপরাধে জড়িতদের দীর্ঘ কারাদণ্ড না দিয়ে মাত্র ৫০ হাজার টাকা নামমাত্র জরিমানা করে ছেড়ে দিচ্ছে, যা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে। জনস্বাস্থ্যের এই চরম বিপর্যয় রুখতে হলে অপরাধীদের আর্থিক জরিমানা নয়, বরং বিশেষ ক্ষমতা আইনের অধীনেই নিয়মিত আদালতে সর্দোপ করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদও এই অব্যবস্থাপনার জন্য অসাধু ফার্মেসি মালিকদের দায়ী করে বলেন, দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মেসির সংখ্যা ২ লাখ ৩৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যার বাইরে আরও ৫০ হাজারের বেশি অবৈধ দোকান রয়েছে। কিন্তু রাস্তার মোড়ে মোড়ে গড়ে ওঠা এই বিপুল দোকান তদারকি করার মতো প্রয়োজনীয় জনবল ও সক্ষমতা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) নেই।

এই মহাচক্রের ভয়াবহতা ঢাকাসহ সারা দেশেই জাল বিস্তার করেছে। এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত গ্যাস্ট্রিক ও অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের নমুনার প্রায় ১০ শতাংশই সম্পূর্ণ মেয়াদোত্তীর্ণ বা চরম নিম্নমানের, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশী-বিদেশী চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে খুলনার ঐতিহ্যবাহী হেরাজ মার্কেটকে কেন্দ্র করে নকল ও অনুমোদনহীন ওষুধের একটি বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যা সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এই বিষ ছড়ানোর মূল উৎস। চট্টগ্রামে গত চার মাসে ১০০টি ওষুধের দোকানে অভিযান চালিয়ে ৯৫টি দোকানেই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়ায় ১০ লাখ টাকার বেশি জরিমানা ও ২২টি দোকান সিলগালা করা হয়েছে। এমনকি কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) গুদামেও ৩০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও ভ্যাকসিন মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের চরম অপচয়।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, বর্তমান ভোক্তা অধিকার আইনে এই পুরো খাতের অনিয়ম শক্তভাবে দমন করার ক্ষেত্রে কিছু আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চিকিৎসা খাতকে অনৈতিক বাণিজ্যিকীকরণ থেকে বাঁচাতে হলে পুরো ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে দ্রুত প্রযুক্তির চাদরে ঢেকে ফেলা এখন সময়ের দাবি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে প্রতিটি ওষুধের প্যাকেটে বাধ্যতামূলক কিউআর কোড (QR Code) ব্যবহার করে ব্যাচ নম্বর ও মেয়াদের তারিখ একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেইসে সংরক্ষণ করতে হবে। একই সাথে লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসিগুলো চিরুনি অভিযানের মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে। সর্বোপরি, সাধারণ রোগীদেরও সচেতন হতে হবে এবং ওষুধ কেনার সময় সতর্কতার সাথে মেয়াদের তারিখ দেখে নিতে হবে, তবেই এই মহাচক্র নির্মূল করা সম্ভব।

তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category