আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলগতভাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পদধারী ও সক্রিয় নেতাদের নির্বাচনে প্রার্থিতা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবে রাজি হয়নি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন কমিশনের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন মূলত নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ায় আইনগতভাবে কেবল নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে কাউকে প্রার্থিতা থেকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। স্থানীয় সরকারের পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য আইনের সাধারণ যোগ্যতার শর্ত পূরণ করলে যে কোনো নাগরিক ভোটে দাঁড়াতে পারবেন এবং এখানে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। তবে জামায়াতে ইসলামীর দেওয়া প্রস্তাবের মুখে ইসি এই অবস্থান স্পষ্ট করলেও, জাতীয় সংসদের আদলে স্থানীয় নির্বাচনে চার ক্যাটাগরির ব্যক্তিদের জন্য প্রার্থিতা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার কঠোর আইনি প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে আজ মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ কমিশন সভায় বসছে ইসি।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আজ আগারগাঁওয়ে ইসি ভবনে নির্ধারিত বৈঠকে স্থানীয় সরকারের পাঁচটি স্তর অর্থাৎ সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আইন ও বিধিমালার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সরকারের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হবে। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি, অন্য দেশের দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণকারী ব্যক্তি, ঋণখেলাপির জামিনদার বা অংশীদার এবং এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা আর স্থানীয় সরকারের কোনো পদে প্রার্থী হতে পারবেন না। এছাড়া নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তির আপিল ট্রাইব্যুনাল দুই সদস্যের বদলে একজন বিচারপতির একক ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব আনা হচ্ছে, যাতে দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা ও আপিল ঝুলিয়ে রাখার সুযোগ বন্ধ করা যায়।
এর আগে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ইসির কাছে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যেন নির্বাচন আচরণবিধিমালার মধ্যে নতুন বিধান যুক্ত করে নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। তবে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বিষয়টি নাকচ করে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, স্থানীয় সরকারে কে কোনো দল করল তা বিবেচনা করা ইসির এখতিয়ারভুক্ত নয়। তবে আইসিটি মামলায় যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, তারা বিচারে খালাস না পাওয়া পর্যন্ত স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আইনি সুযোগ হারাবেন। একই সাথে দেশের সংবিধান অনুযায়ী অন্য দেশের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনকারী বা দ্বৈত নাগরিকদেরও এই নির্বাচনের অযোগ্য করার সুপারিশ পাঠাচ্ছে ইসি।
অন্যদিকে নির্বাচনে ঋণখেলাপিদের আইনি ফাঁকফোকর বন্ধ করতে খেলাপি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার এবং মূল খেলাপিদের পাশাপাশি তাদের জামিনদারদের ওপরও প্রার্থিতায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের রূপরেখা দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও পড়াশোনার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিবেচনায়, তাঁদের ভোটে দাঁড়াতে হলে চাকরি ইস্তফা দিয়ে আসার বিধান যুক্ত করার পক্ষে কমিশন। এর বাইরে নির্বাচনী পরিবেশ শান্ত রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন সূচক স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বিধান বিলুপ্ত করা এবং হলফনামায় ভুল তথ্য দিলে প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের কঠোর প্রস্তাব সরকারের নীতিগত অনুমোদনের জন্য প্রেরণ করা হচ্ছে।