বিদেশে কর্মরত রেমিট্যান্স যোদ্ধা তথা বাংলাদেশী প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, আর্থিক ক্ষমতায়ন এবং বৈশ্বিক ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে পরীক্ষামূলকভাবে ‘প্রবাসী কার্ড’ বা ‘প্রবাস কার্ড’ কর্মসূচি চালু করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক এই কর্মসূচির আওতায় ‘প্রবাসী ডেবিট কার্ড’ ইস্যু করবে। গত শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বিশেষ বৈঠকে এই কর্মসূচির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধানের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাত স্বাধীন গণমাধ্যমকে এই সভার সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বৈঠকে গৃহীত পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে অন্তত পঞ্চাশ হাজার প্রবাসীকে এই বিশেষ কার্ডের আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে এই সংখ্যা দুই লাখে উন্নীত করার জন্য কাজ করবে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো। প্রথম ধাপে জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে ডেবিট কার্ড দেওয়া হলেও, পরবর্তী দ্বিতীয় ধাপে প্রবাসী কার্ড সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম, তদারকি ও বিতরণ ব্যবস্থা পরিচালিত হবে বিশেষায়িত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে। এটি মূলত একটি দ্বি-মুদ্রা বা ডুয়াল কারেন্সি কার্ড হতে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ পরিশোধ ও লেনদেনের পাশাপাশি আধুনিক ব্যাংকিং সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রটিকে অত্যন্ত সহজ ও সুরক্ষিত করে তুলবে। প্রবাসীদের জন্য এটি কেবল একটি সাধারণ প্লাস্টিক কার্ড নয়, বরং এটি তাদের অর্থনৈতিক সুরক্ষার এক অনন্য দলিল হিসেবে কাজ করবে।
এই প্রবাসী কার্ডের সুবিধাভোগীরা দেশে এবং বিদেশে যাতায়াতের সময় বিমানবন্দরগুলোতে এক নজিরবিহীন বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। কার্ডধারী প্রবাসীরা দেশের ভেতর এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। এছাড়া বিমানবন্দরগুলোতে তাদের যাতায়াত সহজ করতে নিবেদিত বুথের মাধ্যমে দ্রুত ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাদের স্বাগত জানানো এবং সহায়তার জন্য বিনামূল্যে বিশেষ অভ্যর্থনা ও নির্দেশনা সেবা দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি বিমান টিকিট বুকিং ও আন্তর্জাতিক হোটেল বুকিংয়ের ক্ষেত্রে কার্ডধারীরা আকর্ষণীয় ছাড়ের সুবিধা পাবেন। দেশে এবং বিদেশে ন্যায্য মূল্যে যানবাহন বা গাড়ি বুকিং করার সুযোগও থাকছে এই কার্ডের মাধ্যমে। বিশেষ করে যারা সিগনেচার কার্ডের অধিকারী হবেন, তারা সরাসরি বিমানবন্দর থেকে গন্তব্যে যাওয়া এবং আসার জন্য বিশেষ গাড়ি বা পিক-আপ এবং ড্রপ-অফ সেবা পাবেন।
বিমানবন্দরের বাইরেও প্রবাসীদের প্রাত্যহিক জীবন ও নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে এই কার্ডের মাধ্যমে ব্যাপক সুযোগ-সুবিধার দ্বার উন্মোচন করা হচ্ছে। দেশের সমস্ত সরকারি হাসপাতালে প্রবাসীদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা সেবা বুথ রাখা হবে এবং নামী বেসকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা থাকবে। কোনো কার্ডধারী প্রবাসী বিদেশে কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে তার মরদেহ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেশে স্থানান্তরের খরচ বহন করা হবে। এছাড়া প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে আসা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ সহায়তার পাশাপাশি তাদের জন্য বিমা সুবিধার আওতা নিশ্চিত করা হবে। দেশের অভ্যন্তরে জমি রেজিস্ট্রেশন বা জমি কেনাবেচা, নামজারি বা মিউটেশন, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির মতো নাগরিক ইউটিলিটি সেবা, বিভিন্ন ব্যবসায়িক লাইসেন্স প্রাপ্তি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কার্ডধারীরা শতভাগ অগ্রাধিকার পাবেন।
প্রবাসীদের অর্থনৈতিক লেনদেনকে গতিশীল করতে এই কার্ডের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর ওপর ভিত্তি করে বিশেষ রিওয়ার্ড পয়েন্ট এবং ক্রেডিট স্কোরিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে, যা পরবর্তীতে তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পাওয়ার পথ সুগম করবে। কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা সরাসরি দেশে টাকা স্থানান্তর করতে পারবেন, যা হুন্ডির মতো অবৈধ পথ পরিহার করে বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে সবাইকে উৎসাহিত করবে। একই সাথে প্রবাসীদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি, নতুন পাসপোর্ট তৈরি বা নবায়ন এবং বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো থেকে কনস্যুলার সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই কার্ডধারীদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সরকারের এই বহুামাত্রিক উদ্যোগটি প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করে দেশের মূল অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে তাদের আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব আরও জানান যে, বর্তমান সরকার তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যেই পারিবারিক কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ক্রীড়াবিদদের জন্য স্পোর্টস কার্ড কর্মসূচি সফলভাবে চালু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার প্রবাসীদের জন্য এই অনন্য প্রবাসী কার্ড চালু হতে যাচ্ছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন যাতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সমস্ত বাংলাদেশী প্রবাসীদের এই কর্মসূচির আওতায় আনা নিশ্চিত করা হয়। এর পাশাপাশি বর্তমান যুগের কর্মসংস্থানের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দেশের ‘জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ বা এনএসডিএ-কে আরও আধুনিক, যুগোপযোগী ও শক্তিশালী করার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেন সরকারপ্রধান। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপদেষ্টা মাহদী আমিন ও রেহান আসিফ আসাদ সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
তথ্যসূত্র: নিউ এজ