বাংলাদেশের নতুন সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে নয়াদিল্লি সফরের একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর গুঞ্জন ছিল যে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে তিনি এই প্রতিবেশী দেশে একটি দ্বিপাক্ষিক সফরে যাচ্ছেন। তবে হঠাৎ করেই দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। নানা ধরণের জটিল কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সমীকরণের কারণে আপাতত ঢাকা এই দিল্লি সফর থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে না যাওয়ার এই আকস্মিক সিদ্ধান্তটি কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত যৌক্তিক ও দূরদর্শী। মূলত তিনটি বড় ধরণের দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক সমীকরণ এই মুহূর্তে ঢাকার নীতিনির্ধারকদের এই সফর স্থগিত করতে বাধ্য করেছে, যার প্রথমটি হলো দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান আস্থার চরম সংকট। আগামী ডিসেম্বর মাসেই শেষ হতে চলেছে দুই দেশের মধ্যকার বহুল আলোচিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি। বর্তমান চুক্তিটির মেয়াদ নতুন একটি স্থায়ী চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত বহাল রাখার জন্য ঢাকার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হলেও দিল্লির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। ফলে একটি শীর্ষ পর্যায়ের সফল সফরের জন্য যে নূন্যতম সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ প্রয়োজন, তা বর্তমানে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।
দ্বিতীয় বড় কারণটি হলো ভারতের বর্তমান চাপ প্রয়োগের একমুখী নীতি এবং সীমান্তে নতুন করে তৈরি হওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা। বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন ও ইতিবাচক যাত্রা শুরুর কথা ভারতের নীতিনির্ধারকেরা মুখে বললেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। উল্টো পুশ-ইনের মতো বিতর্কিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে উত্তেজনা তৈরি করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যুতে অযাচিত হস্তক্ষেপের এক ধরণের প্রচ্ছন্ন চেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। এর বাইরে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কাটি এসেছে গত ১০ই জুলাই, যখন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঘোষণা করেন যে আগামী ডিসেম্বর মাসেই তিনি তার বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত আমলের মতো বর্তমান তারেক রহমান সরকারকেও একটি কৃত্রিম মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলতে ভারতের নীতিনির্ধারকেরা আবারও সেই পুরনো ‘হাসিনা কার্ড’ ব্যবহার করে বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণভাবে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, যা বর্তমান সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব কোনোভাবেই ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করতে পারেননি।
এই কূটনৈতিক দূরত্বের পেছনে আরেকটি অত্যন্ত শক্তিশালী সমীকরণ হলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক চীন সফর। নিজেদের সুনির্দিষ্ট জাতীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির সমীকরণ মাথায় রেখে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়া এবং পরাশক্তি চীনকে বেছে নিয়েছিলেন। আর ঢাকার এই স্বাধীন ও ভারসাম্যমূলক সিদ্ধান্তেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম ও নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচার করতে শুরু করে যে বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্ব ভারতকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে চীনের দিকে গভীরভাবে ঝুঁকে পড়ছে। এমনকি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক এক নারী হাইকমিশনারও এই বিষয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তবে বেইজিং এই প্রচারণার মুখে চুপ থাকেনি। চীনের সরকারি মুখপত্র ‘গ্লোবাল টাইমস’ ভারতের এই ধরণের একচেটিয়া মনোভাবকে সরাসরি ‘দাদাগিরি’ বলে আখ্যায়িত করেছে। একই সাথে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো ধরণের বিদেশী হস্তক্ষেপ বা চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চীন সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করবে। এর পাশাপাশি মোংলা বন্দর উন্নয়ন ও তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের যুক্ত হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দিল্লির ভূরাজনৈতিক উদ্বেগকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যা ঢাকার বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি উপাদান।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দিল্লি সফরকে আপাতত দূরে সরিয়ে রেখে ঢাকা এখন বিকল্প ও একটি শক্তিশালী ভারসাম্যমূলক কূটনীতির রোডম্যাপের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সূত্র থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। তার বদলে ঢাকার সামনে এখন সম্পূর্ণ নতুন ও বৈশ্বিক একটি রোডম্যাপ রয়েছে, যার প্রথম ধাপে রয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশন। আগামী সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে জাতিসংঘের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। এরপরই রয়েছে দ্বিপাক্ষিক জাপান সফর। জাপান সরকার যত দ্রুত সম্ভব বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে টোকিওতে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে দেখতে চায় এবং আগামী ১২ই আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশ-জাপান পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সফরের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করা হবে। এর পাশাপাশি রয়েছে অন্যতম প্রধান মুসলিম রাষ্ট্র সৌদি আরব সফর। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছেন। খুব শীঘ্রই দুই দেশের নীতি নির্ধারকদের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের মাধ্যমে এই সফরের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হবে।
জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকদের মতে, চীন সফরের পর জাপান ও সৌদি আরবের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের সাথে অংশীদারিত্ব জোরদার করার সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সঠিক পদক্ষেপ হবে। প্রবীণ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত আসলে বিগত একনায়কতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ সরকার ও শেখ হাসিনা ছাড়া বাংলাদেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে মন থেকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তারা সবসময়ই নতুন এই প্রশাসনকে এক ধরণের অদৃশ্য চাপের মুখে রাখতে চায়। আর এই বৈরী পরিস্থিতিতে ভারতের দীর্ঘদিনের একমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাবের আমূল পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত দিল্লির সাথে একটি নিরাপদ ও কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখাই বাংলাদেশের সার্বিক মঙ্গলের জন্য সবচেয়ে উত্তম পন্থা। তবে দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের গুরুত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এখন দেখার বিষয় হলো, ভারত কি তার চিরাচরিত ও বিতর্কিত আঞ্চলিক নীতি বদলে বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে চূড়ান্ত মর্যাদা দেবে, নাকি দুই দেশের মধ্যকার এই বিদ্যমান ফাটল আগামী দিনে আরও দীর্ঘ হবে।
সূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪