• রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:০৩ অপরাহ্ন

শরিকদের মান ভাঙাতে নৈশভোজের ডাক বিএনপির

Reporter Name / ২ Time View
Update : রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

গত সাধারণ নির্বাচনের আগে থেকেই দেশের বৃহৎ দুই রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী সম্পূর্ণ আলাদা মেরুতে অবস্থান করছে। রাজনৈতিক আদর্শ ও কৌশলের ভিন্নতার কারণে এই দুই দলের নেতৃত্বে মাঠপর্যায়ে পৃথক দুটি বড় জোটও সক্রিয় রয়েছে। তবে নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে এসে দেশের এই প্রধান দুটি জোটেরই ভেতরে ধীরে ধীরে নানা ধরণের অভ্যন্তরীণ সংকট ও টানাপড়েন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। উভয় জোটেরই প্রধান শরিক দলের বিরুদ্ধে জোটভুক্ত অন্যান্য ছোট দলগুলোর পক্ষ থেকে অবহেলা ও যথাযথ মূল্যায়নের নানামুখী গুরুতর অভিযোগ তোলা হচ্ছে। বিশেষ করে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে উভয় পক্ষের ভেতরের এই রাজনৈতিক জটিলতা এখন আরও বেশি কঠিন রূপ ধারণ করেছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে রাজপথে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিএনপির মিত্র দলগুলোর মধ্যে এক ধরণের গভীর অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। সংসদ নির্বাচনের সময় আসন বণ্টন এবং পরবর্তীতে সরকার গঠনের পর শরিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি বলে তারা মনে করছেন। এমন এক স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে শরিকদের ক্ষোভ ও দূরত্ব দূর করে রাজনৈতিক সমন্বয় জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। সরকার গঠনের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় আগামীকাল সোমবার সন্ধ্যায় দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের এক বিশেষ নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বিএনপির মিত্র দলগুলোর একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা জানিয়েছেন যে, ক্ষোভ ও অসন্তোষ থেকে সৃষ্ট এই দূরত্বের বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে বিএনপির দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে তাদের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা হয়েছে। এমনকি কোনো কোনো শরিক দলের শীর্ষ নেতা ইতিমধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যানের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখাও করেছেন। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০শে জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে এই নৈশভোজের আসর বসবে বলে শরিক দলগুলোর নেতাদের নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরিক দলগুলোর জন্য মোট ১০টির মতো আসন ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপি। এর মধ্যে নিবন্ধিত শরিক দলগুলোর জন্য আটটি আসন রাখা হয়েছিল এবং অনিবন্ধিত দুটি দল ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। এছাড়া অন্য দল থেকে আসা চারজন নেতা বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন। নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারে অংশীদার হিসেবে রয়েছে গণতন্ত্র মঞ্চের গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ ও জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)। সরকারের অংশ হওয়া এই তিনটি রাজনৈতিক দল বাদে ১২ দলীয় জোট, হেফাজতে ইসলাম এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশসহ অন্যান্য শরিকদের কোনো মূল্যায়ন বা অংশীদারিত্ব না থাকায় দেশের ইসলামী রাজনৈতিক অঙ্গনের একটি বিশাল অংশে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

অন্যদিকে, মিত্র দলগুলোর মধ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি এবং নাগরিক ঐক্যের সভাপতির মতো প্রবীণ নেতাদের জন্য নির্বাচনে কোনো আসন ছাড় দেয়নি বিএনপি। ফলে দলীয় প্রতীকে এককভাবে নির্বাচনে লড়াই করে তারা জয়ী হতে পারেননি এবং এই বিষয়টি নিয়ে এই দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের ওপর এক ধরণের প্রচ্ছন্ন ক্ষোভ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গে জেএসডির জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা আমন্ত্রিত হলেও এই নৈশভোজে অংশ নিচ্ছেন না এবং চিঠির মাধ্যমে তাদের না যাওয়ার কারণটি ইসি ও সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দিয়েছেন। তবে দেশের যেকোনো জাতীয় সংকটের মুহূর্তে ঐক্যের ডাকে তারা সবসময়ই পাশে থাকবেন। দলটির অন্য নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে, নতুন সরকারের পাঁচ মাস পার হয়ে গেলেও প্রবীণ রাজনৈতিক নেতাদের খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি প্রধান শরিক দল। অন্যদিকে পরিবারের সদস্যের আকস্মিক মৃত্যুর কারণে নাগরিক ঐক্যের শীর্ষ নেতা ঢাকার বাইরে থাকায় এই অনুষ্ঠানে তার অংশগ্রহণ নিয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

শরিক দলগুলোর এই প্রকাশ্য ক্ষোভ নিরসন করার পাশাপাশি আগামী দিনে রাষ্ট্র বিনির্মাণের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিরোধী দলগুলোর বাইরে বিএনপির সঙ্গে রাজপথে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেওয়া নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত প্রায় সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। নতুন সরকার গঠনের পর শরিকদের সঙ্গে এটিই হবে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম আনুষ্ঠানিক ও যৌথ সাক্ষাৎ। এই উদ্যোগকে শরিকেরা কেবল একটি সাধারণ সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে দেখছেন না, বরং এটিকে জোটের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় জোরদার এবং ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সম্পর্কের নতুন রূপরেখা নির্ধারণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পঞ্চাশটিরও বেশি মিত্র দলকে নিয়ে দীর্ঘ সময় রাজপথে যুগপৎ আন্দোলন পরিচালনা করেছিল বিএনপি। এর মধ্যে অনেকেই এখন মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়ে সরকারের অংশ হয়েছেন, অনেকে সংসদ সদস্য হয়েছেন, আবার অনেকে সমর্থন পেলেও জয়ী হতে পারেননি। নির্বাচনে সমর্থন না পাওয়া দলগুলোর মধ্যে যেমন ক্ষোভ রয়েছে, তেমনি ক্ষমতার অংশীদারিত্ব ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ে মিত্রদের দেওয়া পূর্ব প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন না পাওয়ার এক ধরণের রাজনৈতিক বেদনাও কাজ করছে শরিকদের মধ্যে।

একসঙ্গে আন্দোলন এবং একসঙ্গে সরকার গঠনের যে জনপ্রিয় স্লোগান নির্বাচনের আগে বিএনপি বারবার দিয়েছিল, শরিক দলের অনেকে এখন চাক্ষুষ চাওয়া-পাওয়ার সেই হিসাব মেলাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। মূল্যায়নের অভাবে কেউ হতাশ হয়ে জোটের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন, আবার কেউ কেউ নিজেদের মতো করে মাঠে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। শরিকদের আশা, প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ নৈশভোজে সরকার পরিচালনায় ছোট দলগুলোর ভূমিকা, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমন্বয় নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা ও ফলপ্রসূ আলোচনা হবে। তবে কিছু কিছু প্রবীণ শরিক নেতা স্পষ্ট মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, কেবল দু-একটি দল থেকে কাউকে মন্ত্রিপরিষদে স্থান দিলেই একটি সত্যিকারের জাতীয় সরকার গঠন করা যায় না। সবাইকে নিয়ে সরকার গঠনের যে প্রতিশ্রুতি বারবার দেওয়া হয়েছিল, তার প্রতিফলন তারা দেখতে চান। অন্যদিকে বড় কিছু শরিক দল তাদের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদায়ন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কীভাবে সরকারের সঙ্গে আরও সমন্বিতভাবে কাজ করা যায়, তা নিয়ে লিখিত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে তুলে ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, শরিকদের সঙ্গে তাদের আলোচনা ও যোগাযোগ একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং জোটের অভ্যন্তরীণ সব রাজনৈতিক বিষয় ও সিদ্ধান্ত পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমেই সুরাহা করা হবে।

তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category