কুয়েতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন উচ্ছেদ এবং অবৈধ অভিবাসী বিরোধী এক আকস্মিক সাঁড়াশি অভিযানের জেরে সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশী শ্রমিকেরা এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। গত বুধবার মাঝরাত থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানের পর বাসস্থান হারিয়ে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী প্রবাসীর দিন-রাত কাটছে খোলা রাস্তায় কিংবা চত্বরে। মধ্যপ্রাচ্যের গ্রীষ্মকালীন তীব্র গরম ও প্রায় পঞ্চাশ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মধ্যে আশ্রয়হীন হয়ে পড়ায় অনেক প্রবাসী ইতিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ভুক্তভোগী শ্রমিকদের অভিযোগ, এই চরম সংকটের মুহূর্তে কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে তাদের কোনো প্রকার কার্যকর সহযোগিতা বা আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে না। কুয়েতের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ বাংলাদেশী শ্রমিক কর্মরত আছেন, যার মধ্যে হাসাবিয়া ও আব্বাসিয়া এলাকাতেই ১০ হাজারের বেশি প্রবাসী বাস করেন। হঠাৎ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যৌথ অভিযান চালিয়ে এসব এলাকার পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় রাতারাতি এক বিশাল জনগোষ্ঠী পুরোপুরি গৃহহীন হয়ে পড়েছে।
কুয়েতের প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনী, ন্যাশনাল গার্ড এবং ফায়ার ফোর্স সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় যৌথভাবে এই বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে মূলত অনিরাপদ ভবন, অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ আবাসন, বসবাসের অনুমতি তথা আকামা লঙ্ঘনকারী এবং আবাসিক এলাকায় লাইসেন্সবিহীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই উচ্ছেদের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় বাড়িওয়ালারা রাতারাতি ঘর ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। আগে যেখানে দুই-তিন রুমের ফ্ল্যাট ২০০ থেকে ২৫০ কুয়েতি দিনারে পাওয়া যেত, এখন তা বেড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ দিনার পর্যন্ত ঠেকেছে। বাংলাদেশী মুদ্রায় যা প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকার সমপরিমাণ। সাধারণ কর্মজীবী প্রবাসীদের আয়ের তুলনায় এই ভাড়া আকাশচুম্বী হওয়ায় অনেকেই নতুন বাসা ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছেন। গভীর রাতে পুলিশ এসে মাত্র পাঁচ মিনিটের নোটিশে পাসপোর্ট ও মোবাইল নিয়ে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ায় অনেক শ্রমিক তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও জমানো টাকা পর্যন্ত সাথে আনার সুযোগ পাননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, সদ্য সমাপ্ত অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় পাঠানোর ক্ষেত্রে কুয়েতের অবস্থান অষ্টম স্থানে রয়েছে এবং প্রবাসীরা ১৬১ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ দেশে পাঠিয়েছেন। দেশের অর্থনীতিতে এত বড় অবদান রাখা সত্ত্বেও প্রবাসীদের এই চরম দুর্দিনে পাশে দাঁড়াতে না পারায় দূতাবাসের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ প্রবাসীরা। যদিও এক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে যে, উচ্ছেদের শিকার ব্যক্তিদের জন্য কুয়েত সরকার একটি সরকারি স্কুলে অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থা করেছে এবং দূতাবাসের প্রতিনিধি দল সেখানে সরজমিনে পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু সরকারি ওই আশ্রয় কেন্দ্রে প্রবেশ করলে বৈধ প্রমাণ সাপেক্ষে থাকা গেলেও, সেখান থেকে বাইরে বের হওয়া কিংবা নিজেদের কর্মস্থলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কাজ করার অনুমতি না থাকায় এবং চাকরি হারানোর ভয়ে সিংহভাগ প্রবাসীই এই সরকারি আশ্রয় কেন্দ্রে যাননি।
প্রবাসীদের অভিযোগ, তারা পুরনো ভবনে কম খরচে থাকতেন এবং উচ্ছেদের সরকারি নোটিসের বিষয়টি বাড়ির মালিকেরা ভাড়া হারানোর ভয়ে সম্পূর্ণ গোপন রেখেছিলেন। ফলে কোনো আগাম প্রস্তুতি ছাড়াই তারা রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হয়েছেন। দূতাবাস প্রবাসীদের জন্য কোনো বিকল্প ভবন বা আশ্রয়ের ব্যবস্থা না করে কেবল সরকারি কেন্দ্র পরিদর্শনের মধ্যেই তাদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে বলে প্রবাসীদের দাবি। এই বিষয়ে দেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে যে, কুয়েত সরকারের এই উচ্ছেদ অভিযানটি মূলত তাদের একটি অভ্যন্তরীণ ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত। তবে উদ্ভূত এই সংকটজনক পরিস্থিতির সার্বিক তথ্য বিস্তারিত জেনে আলোচনার মাধ্যমে দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা