১) আমার বাবার এক মামা ব্রিটিশ আমলে ‘এলএমএফ’ ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। এটি ছিল চিকিৎসা বিদ্যায় ডিপ্লোমা। তখন এমবিবিএস ডিগ্রি চালু হয়নি। এলএমএফ ডিগ্রিধারীরাই সাধারণ চিকিৎসা দিতেন। আমার যদি ভুল না হয় তবে আব্বার মামার নাম ছিল মোহাম্মদ আমিন। আমরা তাঁকে ডাক্তার দাদা ডাকতাম। তিনি মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় আসতেন। অনেক গল্প করতেন। তিনি বলেছিলেন— এলএমএফ পাশ করার পর আশেপাশের গ্রামের অনেক লোক তাঁকে দেখতে এসেছিল। সবার হাতে কিছু না কিছু ছিল— পিঠা, নারকেল, কলা, ঘি বা আচারের বয়াম। যে যা পারে তা-ই নিয়ে এসেছিলেন তাঁকে অভিনন্দন জানাতে। ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান তাঁর এলাকার একটি ছেলে ডাক্তার হয়েছে— এই খুশিতে বিশাল মেজবান দিয়েছিলেন।
২) আমার ছোটোবেলা কেটেছে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনিতে। তখন সেখানকার কোনো ছেলেমেয়ে ভালো করলে আনন্দের বন্যা বয়ে যেত। পাড়ার চাচারা সবাই কলোনি মার্কেটে জড়ো হয়ে জিলাপির অর্ডার করতেন। আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ে গলা পর্যন্ত সেগুলো খেতাম। কার ছেলে বা মেয়ে ভালো করল, তা কোনো বিষয় ছিল না। কলোনির সন্তান ছিল সবার সন্তান।
উপরের ঘটনাগুলো বললাম একটি বিশেষ কারণে। তা হলো, একটা সময় মানুষ অন্যের সাফল্যে খুশি হতেন। সেই খুশিতে নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে লোকজনকে খাওয়াতেন।
এইসব দিন এখন রূপকথা হয়ে গেছে। এখন আপনার অন্যতম অপরাধ হচ্ছে—
১) আপনি পারিবারিকভাবে সুখী কেন?
২) আপনি পেশায় ভালো করছেন কেন?
৩) আপনার ছেলেমেয়েরা ভালো রেজাল্ট করছে কেন?
৪) লোকজন আপনাকে বেশি চেনে কেন?
৫) আপনার সুনাম কেন?
মোদ্দাকথা, আপনি ভালো আছেন— এটাই আপনার অপরাধ।
আমরা খেয়ালই করিনি— অদ্ভুত কোমল মনের একটি জাতি কখন বিকৃত জিঘাংসায় পালটে গেলো।
আমরা কি আগের সেই মমতা মাখানো সমাজ ফিরিয়ে আনতে পারি না?
ছবি: ১৯৭৬/৭৭ সালে খোকন ভাইয়ের একটানা ৭২ ঘণ্টা সাইকেল চালানোর সাফল্য উদযাপন উপলক্ষ্যে তাঁকে টাকার মালা পরিয়ে আমাদের কলোনিতে আনন্দ-মিছিল হয়েছিল। টাকা দিয়েছিলেন মুরুব্বীরা। সেকালটা ছিল এরকম মমতাময়।