বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর বা শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নভাবে অনিয়ম-দুর্নীতি কিংবা স্বার্থের সংঘাতে জড়ানোর নজির থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো এত বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধের ইতিহাস পৃথিবীর কোথাও নেই। লেবানন, অ্যাঙ্গোলা কিংবা জার্মানির মতো উন্নত ও অনুন্নত দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ বা সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলেও, একযোগে পুরো পরিচালনা পর্ষদ ও ৩ জন গভর্নরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি তদন্তের ঘটনা বিরল। ২০০৯ সাল-পরবর্তী দেড় দশকজুড়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকারী তিন গভর্নরের বিরুদ্ধেই বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান চালাচ্ছে। এই তদন্তের জালে সাবেক গভর্নরদের পাশাপাশি জড়িয়েছেন বিভিন্ন সময়ের ৭ জন ডেপুটি গভর্নর, বহু নির্বাহী পরিচালকসহ অন্তত ৫৫ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। এদের বিরুদ্ধে মামলা, সম্পদ জব্দ, নথিপত্র তলব ও গ্রেফতারের মতো কড়া আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আর্থিক খাতের এই নজিরবিহীন কেলেঙ্কারিতে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার হয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রভাবশালী সাবেক ডেপুটি গভর্নর সিতাংশু কুমার (এস কে) সুর চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাস। অন্যদিকে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ও আব্দুর রউফ তালুকদার বর্তমানে সম্পূর্ণ পলাতক বা হদিসহীন অবস্থায় রয়েছেন। এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিশ্বের কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এভাবে ঢালাওভাবে অনিয়ম ও দুর্নীতির সহযোগী হয়ে পড়ার দ্বিতীয় কোনো নজির ইতিহাসে নেই। তিনি মনে করেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ব্যাংক লুটেরা ও অলিগার্কদের প্রকাশ্য সহযোগী হিসেবে কাজ করার কারণেই আজ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকদের সততা ও নৈতিকতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে অত্যন্ত খারাপ বার্তা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, ২০০৯ সাল-পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া দেশে আর কারও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ ছিল না। সাবেক অর্থ সচিব এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরীর মতেও, এই বিপর্যয় মূলত রাষ্ট্র জিম্মি হয়ে যাওয়ারই একটি অনিবার্য ফল। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে নানা ব্যাংক জালিয়াতি হলেও রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগত দুর্নীতির দায়ে কখনও গ্রেফতার হননি; বরং রঘুরাম রাজন বা উর্জিত প্যাটেলের মতো গভর্নররা নীতিগত স্বাধীনতা রক্ষায় সরকারের সাথে আপস না করে পদত্যাগ করেছিলেন। একইভাবে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা বা নেপালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানদের বিরুদ্ধেও ব্যক্তিগত আর্থিক অপরাধের বা ফৌজদারি বিচারের কোনো নজির নেই।
২০০৯ সাল-পরবর্তী প্রায় আট বছর দায়িত্বে থাকা গভর্নর ড. আতিউর রহমানের আমলে বেসিক ব্যাংক লুণ্ঠন, সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি ও জনতা ব্যাংকে বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারির মাধ্যমে ব্যাংক খাতে জালিয়াতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে রিজার্ভ চুরির কেলেঙ্কারির মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং বর্তমানে সিআইডির খসড়া চার্জশিটেও তাকে আসামি করা হয়েছে। সাবেক অর্থ সচিব ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদারের মেয়াদে এস আলম গ্রুপসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করার জন্য অনৈতিকভাবে বিশেষ নীতিগত সুবিধা দেওয়া হয়। এর দায়ে দুদক গত ১১ই জুন তিন সদস্যের অনুসন্ধান দল গঠন করে ২০০৯ সাল-পরবর্তী ১৫ বছরের পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যের যাবতীয় মেয়াদের নথিপত্র তলব করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত অপরাধের খেসারত দিতে গিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাত আজ সম্পূর্ণ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বর্তমানে দেশের অন্তত দুই ডজনেরও বেশি ব্যাংক তীব্র মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে এবং গ্রাহকদের আমানতের টাকা ফেরত দিতে পারছে না প্রায় এক ডজন ব্যাংক। ২০০৯ সালে যেখানে দেশের মোট খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার কোটি টাকা, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ তা জ্যামিতিক হারে বেড়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায় এসে ঠেকে। চলতি বছরের মার্চ শেষে বিশেষ ছাড়ে পুনঃতফসিল করার পরও খেলাপি ঋণের স্থিতি ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এই হার বর্তমানে সমগ্র বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিপরীত চিত্রে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়া দেশগুলোও তাদের ব্যাংক খাতকে সুরক্ষিত রেখেছে। বর্তমানে ভারতের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২.২ শতাংশ, পাকিস্তানের ৫.৮ শতাংশ এবং দেউলিয়া দশা থেকে ঘুরে দাঁড়ানো শ্রীলঙ্কার খেলাপি ঋণও এক অঙ্কের ঘরে সীমাবদ্ধ। সবচেয়ে বড় বিপদের বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক ‘ব্যাসেল-৩’ নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিআরএআর) সর্বনিম্ন ১২.৫০ শতাংশ থাকার কথা থাকলেও, গত বছর শেষে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের গড় সিআরএআর ঋণাত্মক ২.৬৪ শতাংশে নেমে গেছে। কোনো কার্যকর অর্থনীতির গড় মূলধন পর্যাপ্ততা এভাবে মাইনাস বা ঋণাত্মক ধারায় চলে যাওয়াকে আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে এক চরম বিরল এবং বিপজ্জনক ঘটনা হিসেবে দেখছেন আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যসূত্র: দৈনিক বণিক বার্তা