ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজের জন্য নিজেদের আকাশসীমা সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছে স্পেন। সোমবার দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেছে। এর মধ্য দিয়ে ইউরোপের ভেতরে ইরান যুদ্ধবিরোধী অবস্থানে সবচেয়ে স্পষ্ট ও সাহসী বার্তা দিল মাদ্রিদ।
আকাশপথ ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্পেনের এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা মার্কিন সামরিক বিমানগুলো আর স্পেনের আকাশপথ ব্যবহার করতে পারবে না। এখন থেকে জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সব ধরনের সামরিক ফ্লাইটকে বিকল্প রুট বেছে নিতে হবে। স্পেনের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘এল পাইস’-এ প্রথম এই খবর প্রকাশিত হয়।
স্পেনের শীর্ষ নেতৃত্বের কড়া বার্তা
আকাশসীমা বন্ধের খবরের সত্যতা নিশ্চিত করে স্পেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্গারিটা রোবেলস সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, “ইরান যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো সামরিক অভিযানের জন্য আমাদের আকাশপথ বা সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের বিন্দুমাত্র অনুমতি দেওয়া হবে না। এই যুদ্ধ সম্পূর্ণ অন্যায় এবং অবৈধ।”
দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ শুরু থেকেই এই যুদ্ধের ঘোর বিরোধিতা করে আসছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে অবিলম্বে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়ে সতর্ক করে বলেন, “একটি অবৈধ কাজের জবাব আরেকটি অবৈধ কাজ দিয়ে দেওয়া যায় না; এভাবেই মূলত বড় বিপর্যয়ের সূচনা হয়।”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন ও ট্রাম্পের হুমকি
স্পেনের এমন অনড় অবস্থান ওয়াশিংটনের সঙ্গে মাদ্রিদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি করেছে। এই পদক্ষেপের জেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাদ্রিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রকাশ্য হুমকিও দিয়েছেন।
তবে স্পেনের অর্থমন্ত্রী কার্লোস কুয়ের্পো এই হুমকির জবাবে বলেছেন, এটি স্পেনের কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী কোনো যুদ্ধে অংশ না নেওয়ার যে রাষ্ট্রীয় নীতি রয়েছে, এটি তারই সুস্পষ্ট প্রতিফলন।
ঘাঁটি ব্যবহারের অতীত ও বর্তমান চিত্র
স্পেন সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, মাদ্রিদ ইতিমধ্যে তাদের ‘রোটা’ ও ‘মোরোন’ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের পাশাপাশি আকাশপথে মার্কিন বিমানের জ্বালানি সরবরাহ (রিফুয়েলিং) সংক্রান্ত সব ধরনের আবেদন সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। তবে ইউরোপে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের লজিস্টিক বা সাধারণ সহায়তায় এসব ঘাঁটি ব্যবহার করা গেলেও, যুদ্ধসংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম সেখানে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকবে।
স্পেনের আরেক সংবাদমাধ্যম ‘এল মুন্ডো’ সম্প্রতি দাবি করেছিল যে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ৭০টি মার্কিন সামরিক ফ্লাইট দেশটির ঘাঁটি ব্যবহার করেছে। তবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই দাবি নাকচ করে দিয়ে স্পষ্ট করেছেন, ওই ফ্লাইটগুলো কেবল সাধারণ পরিবহন কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়েছে, সরাসরি যুদ্ধে নয়।
উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর থেকে তৃতীয় কোনো দেশে সরাসরি সামরিক হামলার জন্য কখনোই নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয়নি স্পেন। চলমান ইরান ইস্যুতেও নিজেদের সেই শান্তিবাদী ও যুদ্ধবিরোধী অবস্থানেই অটল থাকল দেশটি।