আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো জোট বা রাজনৈতিক সমঝোতায় না গিয়ে সম্পূর্ণ একাকী লড়াই করার চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী| তাদের এই আকস্মিক ও একতরফা পদক্ষেপে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং অন্যান্য মিত্র দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি হতে শুরু করেছে| বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সিটি কর্পোরেশনগুলোর মেয়র পদ এবং অন্যান্য স্পর্শকাতর স্থানীয় পদগুলো নিয়ে মিত্রদের মধ্যে যে চাপা উত্তেজনা ছিল, তা এখন প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে| স্থানীয় রাজনীতির মাঠে একক আধিপত্য বিস্তারের এই চেষ্টার কারণে বিরোধী শিবিরের মধ্যে এক ধরনের অবিশ্বাস ও বিভেদ সৃষ্টি হয়েছে|
এই রাজনৈতিক পটভূমির প্রেক্ষাপট গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বহুল আলোচিত সাধারণ নির্বাচনের ঠিক আগে, জানুয়ারি মাসে জামায়াত ও এনসিপির নেতৃত্বে ১১ দলীয় একটি বৃহৎ জোট আত্মপ্রকাশ করেছিল| সেই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দুই-তৃতীয়াংশ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিপুলভাবে সরকার গঠন করলেও, এই নতুন জোটটি ৭৭টি আসন নিজেদের ঝুলিতে পুরতে সক্ষম হয়| তবে শুরু থেকেই দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমালোচকরা এই জোটটিকে একটি ‘অস্বাভাবিক রাজনৈতিক বিয়ে’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছিলেন| এর মূল কারণ হলো, দেশের অন্যতম পুরোনো ও কট্টর একটি ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা একটি প্রগতিশীল নতুন রাজনৈতিক শক্তির আদর্শিক মিল খুব সামান্যই ছিল| জোট গঠনের পরপরই সেই আদর্শিক দ্বন্দ্বের প্রকাশ ঘটে এবং প্রতিবাদস্বরূপ এনসিপির ১৪ জন জ্যেষ্ঠ ও প্রভাবশালী নেতা একযোগে পদত্যাগ করেছিলেন| এখন যেহেতু জাতীয় পর্যায়ে একসঙ্গে কাজ করার বা ক্ষমতা ভাগাভাগি করার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই, তাই এই জোটের ভেতরের পুরোনো ফাটলগুলো আবার নতুন করে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে|
এই আকস্মিক রাজনৈতিক বিভাজনের সবচেয়ে বড় ও প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে বর্তমান শাসক দল বিএনপির ওপর| ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা দলটি এই স্থানীয় নির্বাচনগুলোকে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তির একটি বিশাল ও চূড়ান্ত পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করছে| বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে মতবিনিময় সভা চালিয়ে যাচ্ছেন| তার মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি ইউনিয়ন, ওয়ার্ড এবং পৌরসভায় দল-সমর্থিত একজন করে শক্তিশালী একক প্রার্থী চূড়ান্ত করা, যাতে দলের ভেতরে কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকে এবং নিজেদের মধ্যে ভোট ভাগাভাগি শূন্যের কোঠায় নেমে আসে|
যদি জামায়াত ও এনসিপি জোটবদ্ধ হয়ে এই নির্বাচনে অংশ নিত, অথবা অন্তত আসন ভাগাভাগির কোনো অলিখিত কিন্তু কার্যকর সমঝোতায় পৌঁছাতে পারত, তবে তারা বিএনপির শক্ত ঘাঁটিগুলোতে একটি বড় ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হতো| সম্মিলিত সাংগঠনিক শক্তি ও তারুণ্যের উদ্দীপনাকে কাজে লাগিয়ে তারা একটি শক্তিশালী বিরোধী ব্লক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারত| কিন্তু এর পরিবর্তে জামায়াতের একলা চলো নীতি এবং এর ফলে এনসিপির সঙ্গে তৈরি হওয়া দূরত্বের কারণে আনুষ্ঠানিক প্রচারণার আগেই বিরোধী শিবিরের ভোট শোচনীয়ভাবে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে| বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, মর্যাদাপূর্ণ ও প্রতীকী মেয়র নির্বাচনগুলোতে এই বিভাজনের কারণে বিএনপি স্বভাবতই বড় ধরনের বাড়তি সুবিধা পেতে যাচ্ছে|
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনে অনুষ্ঠিত একটি আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার দলের পক্ষ থেকে নয় দফা সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেন| এই দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া, নিষিদ্ধ ঘোষিত দলের শীর্ষ নেতা ও দলীয় তকমাধারী বিতর্কিত প্রশাসকদের যেকোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখা, বিএনপির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকা একজন ঊর্ধ্বতন নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তাকে অবিলম্বে অপসারণ করা এবং মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার ওপর কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা|
তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের জানান যে, তাদের এই দাবিগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় নির্বাচন কমিশন এরই মধ্যে মেনে নিয়েছে এবং বাকিগুলো এখনো তীব্রভাবে বিবেচনাধীন রয়েছে| কিছু নির্দিষ্ট দাবির বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সরাসরি সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের ‘অসহায়ত্ব’ প্রকাশ করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন| তবে এত কিছুর পরও জামায়াত আপাতত নির্বাচন বর্জনের মতো কোনো চরমপন্থী চিন্তাভাবনা করছে না, বরং তারা তাদের যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য আইনি কাঠামো ও রাজনৈতিক মাঠের চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখবে বলে দৃঢ়ভাবে জানিয়েছে| ওই একই সংবাদ সম্মেলনে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটটি গঠন করা হয়েছিল শুধুমাত্র জাতীয় নির্বাচনের বৃহত্তর রণকৌশল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে| স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো স্তরেই জোটবদ্ধ হয়ে প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে কোনো ধরনের পূর্বানুমোদিত সিদ্ধান্ত বা চুক্তি তাদের মধ্যে ছিল না| জামায়াতসহ জোটের প্রতিটি শরিক দল সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ও নিজস্ব ‘স্বতন্ত্র’ পরিচয়ে নিজেদের প্রার্থী মাঠে নামানোর পূর্ণ অধিকার রাখে| এর অত্যন্ত সহজ ও সোজা অর্থ হলো, আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে সাবেক মিত্রদের মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে সরাসরি ভোটের লড়াই ও রাজনৈতিক সংঘাত এখন প্রায় অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে|
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, জামায়াত এই স্থানীয় নির্বাচনগুলোকে প্রকাশ্যে নিজেদের ‘তৃণমূল শক্তির পরীক্ষা’ হিসেবে বর্ণনা করলেও এর পেছনে একটি কঠিন বাস্তববাদী ও সুদূরপ্রসারী হিসাব-নিকাশ কাজ করছে| জোটের অন্য নবীন শরিকদের তুলনায় জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তি তৃণমূল পর্যায়ে অনেক বেশি সুদৃঢ়, সুশৃঙ্খল ও বিস্তৃত| একলা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে তারা তাদের এই সাংগঠনিক শক্তির পুরো রাজনৈতিক কৃতিত্ব সম্পূর্ণ একাই নিতে চাইছে| অপেক্ষাকৃত দুর্বল মিত্রদের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে নিজেদের রাজনৈতিক বিকাশের সম্ভাবনাকে সীমিত করতে তারা আর বিন্দুমাত্র আগ্রহী নয়| তবে বিরোধী শিবিরের এই চরম ফাটল ঠিক এমন একটি স্পর্শকাতর সময়ে দেখা দিল, যখন শাসক দল বিএনপি সারা দেশে নিজেদের একক প্রার্থী চূড়ান্ত করে সাংগঠনিক ভিত আরও অপ্রতিরোধ্য করে তুলছে| একটি বিভক্ত ও দুর্বল বিরোধী দল মূলত একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী শাসক দলকেই সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক সুবিধা এনে দেয়|
অন্যদিকে, দেশের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির মাঠে খেলাফত মজলিস ও হেফাজতে ইসলামের মধ্যে নতুন করে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সমীকরণ ও মেরুকরণ থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, দেশের বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো একটি সুসংহত, ঐক্যবদ্ধ ও বৃহত্তর বিকল্প প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার বদলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ছে| ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর যে সাধারণ আপামর নাগরিকরা দেশের রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন, স্বচ্ছতা এবং সত্যিকারের রাজনৈতিক নবজাগরণের দীর্ঘমেয়াদী স্বপ্ন দেখেছিলেন, বিরোধী শিবিরের এই ধরনের স্বার্থান্বেষী বিভাজন তাদের জন্য চরম হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে| এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও এক ধরনের বিভ্রান্তি ও অনীহা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে| যখন সাবেক জোটের নেতারাই একে অপরের বিরুদ্ধে মাঠে নামছেন, তখন ভাসমান ভোটাররা বিভক্ত প্রার্থীদের দেখে হতাশ হতে পারেন| বিরোধী দলের এই খণ্ডিত ও ভঙ্গুর রূপ বিএনপির একচ্ছত্র ও ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের বিপরীতে একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ও ঐক্যবদ্ধ ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে কেবল স্তিমিতই করছে না, বরং মারাত্মকভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে|
তথ্যসূত্র: নাটশেল টুডে