ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আশ্রয়ে থাকা ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বিতর্কিত অডিও সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সমীকরণে এক নতুন ধরনের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন ও স্নায়ুযুদ্ধ দেখা দিয়েছে। তবে এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহের মধ্যেই আগামী ১২ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর ভারতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস আউটরিচ সম্মেলনে অংশ নিতে পারেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিগত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির দিনে দিল্লির একটি বেসরকারি গণমাধ্যম মঞ্চে যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ঘটনাকে বাংলাদেশ সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে এ নিয়ে কড়া কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া জানানো হলেও ভৌগোলিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রতিবেশীর সাথে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন নীতিনির্ধারকরা। ফলে আসন্ন এই সম্ভাব্য সফরটিকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন দুই দেশের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জায়গাটি পরীক্ষার মুখে পড়েছে, অন্যদিকে সীমান্ত সুরক্ষা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তি, বাণিজ্যিক শুল্ক বাধা দূরীকরণ এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের কৌশলগত সহযোগিতার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনার এক নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টোরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশনের (বিমসটেক) বর্তমান চেয়ারপারসন বা সভাপতি পদমর্যাদায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিকস আউটরিচ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য বিশেষ আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পাঠিয়েছে ভারত। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, বিমসটেক জোটের প্রধান হিসেবেই এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারেরই অংশ। এ ছাড়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পরপরই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় সফরের একটি পৃথক চিঠি তারেক রহমানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ভারতের দেওয়া এই জোড়া আমন্ত্রণের বিপরীতে বাংলাদেশ সরকার তাদের প্রস্তুতি গুছিয়ে রাখছে। সরকারের নীতি প্রণেতাদের অভিমত হলো, প্রতিবেশীর সাথে সুনির্দিষ্ট কিছু ইস্যুতে মতভেদ বা তিক্ততা থাকলেও প্রতিবেশি রাষ্ট্র পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ফলে জটিল রাজনৈতিক অসংগতিগুলোর অবসান ঘটাতে হলে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। তবে এবার আর একপক্ষীয় কোনো নতিস্বীকার নয়, বরং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে মূল উপজীব্য করে সমতার ভিত্তিতে আলোচনার টেবিলে বসতে চায় বর্তমান প্রশাসন।
তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য এই সফর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় মনস্তাত্ত্বিক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দিল্লির মাটিতে বসে শেখ হাসিনার অডিও সংবাদ সম্মেলন। গত ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনে সাউথ এশিয়ান ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের (এফসিসি) মাধ্যমে শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল বক্তব্য ও রাজপথের ঘটনা নিয়ে মন্তব্য ঢাকাকে চরমভাবে ক্ষুব্ধ করেছে। ভারতের মাটিতে থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করার এমন প্রচেষ্টাকে দেশের সার্বিক সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা ও রাজপথের দলগুলো। এর আগে ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতীয় হাইকমিশনারের মাধ্যমে দিল্লির কাছে স্পষ্ট বার্তা পাঠানো হয়েছিল, যেন সেখানে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনুমোদন করা না হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও দিল্লিতে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলন দুই দেশের সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার গতিকে ব্যাহত করেছে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এই বিষয়ে স্পষ্ট এবং কঠোর কূটনৈতিক বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশ সবসময় তার নিকট প্রতিবেশী ভারতের সাথে অর্থবহ ও ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী, তবে সেই সম্পর্ক হতে হবে সম্পূর্ণ সমতার ভিত্তিতে, সার্বভৌম সমতা বজায় রেখে এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে। ভারতের মাটিতে বসে স্বৈরাচারী শাসনের অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো পলাতক নেতা যদি বাংলাদেশে নতুন করে উসকানি বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র চালানোর সুযোগ পান, তবে তা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে চরম উদ্বেগের ও ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। প্রতিমন্ত্রী মনে করেন, ভারত যদি বাংলাদেশের জনগণের এই সেন্টিমেন্ট বুঝতে সক্ষম হয়, তবেই দুই দেশের ভবিষ্যত সম্পর্কের জন্য তা কল্যাণকর হবে। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী যোগ দেবেন কি না, তা তাঁর ব্যক্তিগত কর্মসূচি এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া নিয়ে দেশের ক্ষমতাসীন জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সরাসরি গণমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন যে, ভারত সরকার কোন যুক্তিতে একজন দণ্ডপ্রাপ্ত এবং আশ্রয়প্রাপ্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কথা বলার এমন অবাধ সুবিধা দিল। অন্যদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই ঘটনাকে একটি গভীর ষড়যন্ত্র এবং গণ-অভ্যুত্থানের দেড় হাজারেরও বেশি শহীদের রক্তের প্রতি চরম অবমাননা হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিএনপি নেতাদের মতে, পতন দিবসের মতো একটি স্পর্শকাতর দিনে শেখ হাসিনাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে ভারত সরকার তাদের “ডাবল স্ট্যান্ডার্ড” বা দ্বিমুখী নীতির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে, যা ঢাকার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথকে আরও জটিল করে তুলবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাঁদের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রকের মুখপাত্র স্পষ্ট করেছেন যে, দিল্লির ওই সংবাদ সম্মেলনটি ছিল সম্পূর্ণ একটি বেসরকারি মিডিয়া সংস্থার নিজস্ব আয়োজন এবং তার সাথে ভারত সরকারের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল না। ওই অনুষ্ঠানে ব্যক্ত হওয়া কোনো মতামত বা বক্তব্যকে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন বা অনুমোদন করে না বলেও তারা দাবি করেছে। তবে দিল্লির এই ব্যাখ্যার পরও বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে সৃষ্ট অসন্তোষ পুরোপুরি কমে যায়নি। কারণ এর আগে ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া চিঠির কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি, যা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রধান বিরোধী ও অন্যান্য দলগুলোর জন্য ইস্যু তৈরির বড় ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য এই সফরটি যেমন কূটনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জিং, তেমনি রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত সংবেদনশীল। সরকার গঠনের পর তিনি ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া ও চীন সফর সম্পন্ন করেছেন এবং সেপ্টেম্বরেই জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য মিত্রদের সাথে সম্পর্কের পাশাপাশি ভারতের সাথে ঝুলে থাকা পানি চুক্তি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অর্থনৈতিক ট্রানজিট এবং সীমান্ত নিরাপত্তা বজায় রাখা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অতীব জরুরি। শেষ পর্যন্ত নিজ দেশের জনগণের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে এবং ভারতের সাথে তৈরি হওয়া তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক কূটনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ সামলে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নয়াদিল্লি সফরে যান কি না এবং নরেন্দ্র মোদির সাথে বৈঠকে বসলে সেখান থেকে বাংলাদেশের পক্ষে কতটা ইতিবাচক ফল অর্জিত হয়, তা দেখতে মুখিয়ে আছে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মহল।