• শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৭ অপরাহ্ন
Headline
নবীজির স্মৃতিধন্য জলপাই বাগান দখলে ইসরাইলিরা যত্ন অর্থনীতি বা ‘কেয়ার ইকোনমি’: বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ৩ এনসিটিবির উপসচিব-সদস্যসহ আরও ৪ কর্মকর্তাকে বদলি তাহসিফের মৃত্যুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি রয়েছে: জামায়াত সশস্ত্র বাহিনী বোর্ডের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন ফি ১৬৮ টাকা রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ শুরু খাদ্যশস্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে: খাদ্যমন্ত্রী মানবতাবিরোধী অপরাধে হানিফের মৃত্যুদণ্ড, অপর তিন আসামির আমৃত্যু কারাদণ্ড চার বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষক কার্ড দেবে সরকার

কূটনৈতিক টানাপোড়েনে ভারতে বাণিজ্য ধস ও বাংলাদেশের বিকল্প পথ

Reporter Name / ৯৮ Time View
Update : রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে প্রতিবেশী বাংলাদেশের ওপর রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ আরোপ করে চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছিল ভারত। ভিসা কড়াকড়ি, সীমান্ত বন্ধ করা এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য থমকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও দিনশেষে এই ভূরাজনৈতিক কৌশলের উল্টো ধাক্কা এসে পড়েছে খোদ ভারতেরই অর্থনীতির ওপর। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদারকে হারিয়ে ভারত এখন এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। সরকারি ও কূটনৈতিক পরিসংখ্যান বলছে, বিগত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ভারতের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ সাড়ে চার বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি কমে গেছে, যার পরিমাণ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় পাঁচ হাজার কোটি রুপি। রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে গিয়ে ভারত যে বিশাল বাণিজ্যিক শূন্যতা তৈরি করেছে, তা তাদের নিজস্ব উৎপাদন, কৃষি, সেবা এবং সীমান্ত অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে।

খাতা-কলমের অফিশিয়াল তথ্যের দিকে নজর দিলে রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে বাণিজ্যের আসল চিত্র ফুটে ওঠে। ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশে ভারতের মোট রপ্তানি যেখানে ছিল ১৬.১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ছিল দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের সর্বোচ্চ শিখর; সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে তা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০.৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশে ভারতীয় পণ্যের বিক্রি কমেছে প্রায় ৩৪.৫ শতাংশ। চাল, গম, পেঁয়াজ, কাঁচা তুলা, সুতা, পেট্রোকেমিক্যাল এবং শিল্প যন্ত্রাংশের মতো প্রধান প্রধান ভারতীয় পণ্যের রফতানি বাজার বাংলাদেশ থেকে দ্রুত হাতছাড়া হয়ে গেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতিতে। অতীতে বাংলাদেশ যেখানে প্রতিবছর ১৪ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতিতে ভুগত, সেখানে বর্তমানে তা কমে ৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা ভারতের রপ্তানি অর্থনীতির জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক পিছু হটা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ভারতের রপ্তানি অর্থনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি হলো তাদের টেক্সটাইল বা পোশাক খাতের কাঁচামাল শিল্প। বিশ্বজুড়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের হাজার হাজার গার্মেন্টস কারখানার প্রধান কাঁচামাল বা কাঁচা তুলা ও সুতার বড় অংশই যেত ভারত থেকে। ভারতের গুজরাট, তামিলনাড়ু ও মধ্যপ্রদেশের স্পিনিং মিলগুলো বহুলাংশে বাংলাদেশের অর্ডারের ওপর নির্ভর করে চলত। কিন্তু ভারত সরকারের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের পর কটন অ্যান্ড টেক্সটাইল এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভারতীয় সুতা ও পোশাকের কাঁচামাল রপ্তানি গত দুই বছরে প্রায় ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে ভারতের নিটওয়্যার রাজধানী বলে পরিচিত তামিলনাড়ুর তিরুপুর এবং গুজরাটের সুরাটের কারখানাগুলো অভূতপূর্ব মন্দার মুখোমুখি হয়েছে। ভারতীয় একক নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা চীন, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও উজবেকিস্তান থেকে কাঁচামাল আনা শুরু করায় ভারতীয় মিলগুলোতে হাজার হাজার টন সুতা ও তুলা অবিক্রিত অবস্থায় জমে গেছে। ফলে উৎপাদন ক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে এবং হাজার হাজার ভারতীয় কর্মী চাকরি হারিয়েছেন।

শিল্প খাতের পাশাপাশি এই দ্বিপাক্ষিক সংঘাতের বড় খেসারত দিতে হচ্ছে ভারতের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে। পশ্চিমবঙ্গের, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ ও পাঞ্জাবের কৃষকদের কাছে ভৌগোলিক সুবিধার কারণে বাংলাদেশে শাকসবজি ও খাদ্যপণ্য পাঠানো ছিল অত্যন্ত লাভজনক। কিন্তু ভারতের নীতি নির্ধারকরা যখনই সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা ছাড়া পেঁয়াজ রপ্তানিতে শুল্ক বৃদ্ধি কিংবা চাল রপ্তানি বন্ধ করে বাংলাদেশকে কাবু করতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ তখন আন্তর্জাতিক খোলা বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহ শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশ চাল, গম, পেঁয়াজ ও রসুন রাশিয়া, ইউক্রেন, মিয়ানমার, মিশর, তুরস্ক এবং ব্রাজিল থেকে আমদানি করছে। ফলে ভারতের কৃষকরা তাদের স্থায়ী বাজার চিরতরে হারিয়েছেন। পেট্রাপোল ও গেদে সীমান্তে কোটি কোটি টাকার পচনশীল খাদ্যপণ্য ট্রাকে পচে নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভারতের স্থানীয় বাজারগুলোতে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে ধস নেমেছে পেঁয়াজ ও চালের দামে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ভারতীয় কৃষকদের।

ভারতের ভৌগোলিক দিক থেকে সংবেদনশীল উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আটটি রাজ্য বা সেভেন সিস্টার্স এই বাণিজ্যিক বাধার কারণে সবচেয়ে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে পণ্য আনা যেখানে অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সেখানে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুবিধা বন্ধ হওয়ায় এবং বর্ডার হাটগুলো অচল হয়ে পড়ায় উত্তর-পূর্ব ভারতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি তৈরি করেছে। সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় ছোট ব্যবসায়ীরা বেকার হয়ে পড়েছেন। অপরদিকে সেবামূলক খাত বিশেষ করে ভারতের চিকিৎসা ও খুচরা পর্যটন খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কলকাতা, চেন্নাই, ভেলোর এবং দিল্লির করপোরেট হাসপাতালগুলোর মোট আয়ের ৬০ শতাংশ আসত বাংলাদেশি রোগীদের কাছ থেকে। ভিসা জটিলতার কারণে বাংলাদেশি পর্যটক ও রোগী আসা কমে যাওয়ায় কলকাতার নিউ মার্কেট ও ট্রাভেল খাত অচল হয়ে পড়েছে এবং খালি পড়ে আছে ভেলোরের হাসপাতালগুলোর সংরক্ষিত ওয়ার্ড। বাংলাদেশের মানুষ এখন চিকিৎসা ও পর্যটনের জন্য বিকল্প হিসেবে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন ও তুরস্কে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় ভারতের এই রাজনৈতিক পদক্ষেপটি শেষ পর্যন্ত একটি বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক ব্যাকফায়ারে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেশীদের ওপর একপাক্ষিক প্রভাব বিস্তারের পুরানো কৌশল মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে কাজ করেনি, বরং মিয়ানমার, চীন, নেপাল, পাকিস্তান কিংবা শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশের সাথেও বাণিজ্যিক দূরত্ব বাড়িয়ে ভারত আঞ্চলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে ভারতের এই আকস্মিক দ্বার বন্ধ করে দেওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ভারতের ওপর একক নির্ভরশীলতা কমিয়ে বাংলাদেশ নিজের বৈশ্বিক আমদানির উৎস বহুলাংশে বৈচিত্র্যময় করতে সক্ষম হয়েছে, যার ফলে বিকল্প বড় বিশ্বশক্তির সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক ও আত্মনির্ভরশীলতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category