• বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২২ অপরাহ্ন

ক্ষমতার টানাপোড়েনে রাষ্ট্রপতি: কেমন হবে আগামীর সমীকরণ?

Reporter Name / ৫৯ Time View
Update : বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির পদটি যেন এক বিশাল নাটকমঞ্চের কেন্দ্রবিন্দু। এই মঞ্চে নায়ক আছেন, খলনায়ক আছেন, আছেন অসংখ্য দর্শকও। কিন্তু যিনি সবচেয়ে বড় পদটিতে আসীন, সেই রাষ্ট্রপতির নিজস্ব কোনো দৃশ্যমান পারফরম্যান্স বা ক্ষমতা নেই; অথচ তাঁকে ছাড়া আবার নাটকটিও সম্পূর্ণ অচল। দেশের চলমান রাজনৈতিক সমীকরণে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের অবস্থাও অনেকটা সেই চরিত্রের মতোই। সরকার বদল, রাজনীতির ভাষার পরিবর্তন এবং ক্ষমতার নতুন বিন্যাসের পরও আগের সরকারের নিয়োগ দেওয়া এই রাষ্ট্রপতিকে ঘিরেই এখন আবর্তিত হচ্ছে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক টানাপোড়েন।

ত্রয়োদশ সংসদের উত্তপ্ত সূচনা ও অদ্ভুত এক স্ববিরোধিতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হতেই সংসদ ভবনের ভেতরে এক নজিরবিহীন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। নিয়মানুযায়ী রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন তাঁর লিখিত ভাষণ পড়া শুরু করতেই বিরোধী দলের সদস্যরা তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন। সংসদ কক্ষে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন, ‘জুলাইয়ের গাদ্দার’ স্লোগান এবং তুমুল হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। আর এই চরম বিশৃঙ্খলার মাঝেই ক্যামেরার লেন্স গিয়ে স্থির হয় তারেক রহমানের দিকে, যাঁর মুখে তখন লেগে ছিল এক রহস্যময় মৃদু হাসি। এই ঘটনা একটি বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—বর্তমান রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে সরকারের আসল পরিকল্পনা কী? একদিকে যেমন আওয়ামী লীগের সমর্থকরা অভিযোগ করছেন যে, রাষ্ট্রপতি এখন ভোল পাল্টে আগের সরকারের সমালোচনা করছেন, যা তাদের চোখে চরম দ্বিচারিতা। অন্যদিকে, বিরোধী দলের অভিযোগ—জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার ওপর যখন নির্বিচারে গুলি চলছিল, তখন এই রাষ্ট্রপতি নীরব ছিলেন। এই অভিযোগ তুলেই তারা রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কটের ঘোষণা দিয়ে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। কিন্তু রাজনৈতিক মহলে এখন এই প্রশ্নটিও জোরালোভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে যে, জুলাই আন্দোলনের পর যখন এই রাষ্ট্রপতির অধীনেই অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নিয়েছিল এবং প্রায় সব বড় দলের নেতারাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তখন এই নৈতিক আপত্তিগুলো কোথায় ছিল?

আলংকারিক পদ ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা

রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের উত্তর খুঁজতে গেলে দৃষ্টি দিতে হয় দেশের সংবিধানের দিকে। শুনতে দেশের সর্বময় কর্তা মনে হলেও বাস্তবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদটি অনেকটাই আলংকারিক। সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতি তাঁর প্রায় সব কাজই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী করে থাকেন। সংসদে রাষ্ট্রপতি যে ভাষণটি পাঠ করেন, তা মূলত ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রিসভা কর্তৃক অনুমোদিত এবং তাদেরই লেখা। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এবং বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিমের মতো জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকরাও একই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা স্পষ্ট করেছেন যে, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেই রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতাসীন সরকারের নীতি ও বয়ান অনুযায়ী কথা বলতে হয়। এখানে তাঁর নিজস্ব পছন্দ-অপকৌশল বা ব্যক্তিগত মতাদর্শ প্রকাশের কোনো আইনি সুযোগ নেই।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতির ভাগ্যের নির্মম পতন একটি সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। ১৯৯১ সালের পটপরিবর্তনের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন প্রশংসিত হলেও, পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ তাঁকে রাষ্ট্রপতি বানালে এবং ২০০১ সালে ক্ষমতা হারালে তাঁর গায়েই ‘বিশ্বাসঘাতক’ তকমা সেঁটে দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে, বিএনপি সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে এক বছরের মাথায় পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। আবার অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে একসময় আওয়ামী লীগ ‘ইয়েসউদ্দিন’ বলে ট্রল করলেও পরে বিএনপিও তাঁকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে আখ্যা দেয়। বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজের মতে, এই পুরো সংকটের মূল কারণ হলো প্রধানমন্ত্রীর হাতে সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকা। রাষ্ট্রপতির কোনো কার্যকর ক্ষমতা না থাকায় তিনি সবসময় ক্ষমতাসীনদের হাতের পুতুলে পরিণত হন।

গণভোটের পর ক্ষমতার নতুন দিগন্ত

রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের প্রক্রিয়াটি সংসদে অত্যন্ত জটিল হওয়ায় সহসাই যে তাঁকে সরানো যাচ্ছে না, তা একপ্রকার নিশ্চিত। তবে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা কাটানোর একটি নতুন আইনি পথ উন্মুক্ত হয়েছে। সংবিধানের এই নতুন সংস্কার প্রস্তাব অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি এখন থেকে সম্পূর্ণ নিজস্ব সিদ্ধান্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে নিয়োগ দিতে পারবেন। এছাড়া ভবিষ্যতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠিত হলে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক মর্যাদা ও ভূমিকা আরও সুসংহত হবে। তবে ক্ষমতার এই বিস্তৃতির পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ক্ষমা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির একচ্ছত্র ক্ষমতায় লাগাম টানা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রপতি পদটি আর কেবলই একটি আলংকারিক বা আনুষ্ঠানিক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং ভবিষ্যতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি ভারসাম্যপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি হতে যাচ্ছে। তবে এই নতুন ক্ষমতার প্রয়োগ কখন এবং কার হাত ধরে শুরু হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category