• সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১০:০৯ অপরাহ্ন
Headline
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এডিবি প্রেসিডেন্টের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে ইরানের সম্মতি, চুক্তির সম্ভাবনা আতাউর রহমান সম্পর্কে আবুল হায়াতের আবেগঘন স্মৃতিচারণ সুস্থ ও প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা গরু চেনার উপায় চুক্তি না হলে ইরানের সঙ্গে ‘বড় সংঘাতের’ হুঁশিয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টাঙ্গাইলে রডবাহী ট্রাক খাদে উল্টে নিহত পনেরো যাত্রী টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজায় নেই কোরবানির ঈদ চাঁদপুরে আকস্মিক ঝড়ের কবলে যাত্রীবাহী লঞ্চ আহত অর্ধশতাধিক গরু কোরবানির দাবিতে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু খামারিদের বিক্ষোভ শিশু রামিসা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল শুনানি জুনে

ক্ষমতার পটপরিবর্তন থেকে দারিদ্র্য বিমোচন: রাজনীতির মাঠে এক ‘ভাইরাল’ প্রাণীর গল্প

Reporter Name / ৭৪ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় কান পাতলে গত আট দশক ধরে একটি প্রাণীর সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, আর সেটি হলো ছাগল। শুনতে অবাক লাগলেও দেশের রাজনীতির মাঠে এই প্রাণীটির প্রভাব ও ভূমিকা বেশ চমকপ্রদ। এর শুরুটা হয়েছিল সেই ১৯৪৬ সালে নোয়াখালী দাঙ্গার সময়। সে সময় শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে সেখানে ছুটে এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। নিরামিষভোজী এই নেতার দুধের চাহিদা মেটাতো তার পালিত একটি ছাগল। কিন্তু একদিন সেটি চুরি হয়ে গেলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশের বদলে শান্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, প্রাণীটি অন্তত কারও না কারও উপকারে এসেছে। এরপর বেশ কয়েক দশক এই বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো চর্চা না হলেও, পরবর্তীতে এটি বারবার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে এসেছে।

দীর্ঘ বিরতির পর ২০০১ সালে ছাগল ইস্যুটি আবারও তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়। সে সময় ক্ষমতায় এসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশের দরিদ্র নারী ও কৃষকদের স্বাবলম্বী করতে ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল বিতরণের এক বিশাল প্রকল্প হাতে নেন। বছরে দুবার এবং প্রতিবার একাধিক বাচ্চা দেওয়া এই প্রাণীটি একটি দরিদ্র পরিবারের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে উঠবে—এমনটাই ছিল এই উদ্যোগের মূল দর্শন। কিন্তু হাজার হাজার ছাগল বিতরণের পর দু-একটি মারা যাওয়ার স্বাভাবিক ঘটনাকে পুঁজি করে তৎকালীন বিরোধী দল পুরো প্রকল্পটিকে তুমুল বিতর্কের মুখে ফেলে দেয়। এরপর ২০০৫-২০০৬ সালের দিকে দেশের ব্লগিং জগতেও প্রবেশ করে এই প্রাণীটি। সে সময় বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারীদের আক্রমণাত্মকভাবে ‘ছাগু’ বলে ডাকার এক নতুন ও বিতর্কিত সংস্কৃতির জন্ম হয়, যা রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুড়িতে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।

তবে রাজনীতিতে এই প্রাণীর সবচেয়ে বড় ও বিধ্বংসী প্রভাবটি দেখা যায় ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে। কোরবানির ঈদের ঠিক আগে সাদিক অ্যাগ্রো থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তৎকালীন প্রভাবশালী সদস্য মতিউর রহমানের ছেলে ১৫ লাখ টাকা দামের একটি ছাগল কিনে সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ যখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, তখন একজন সরকারি কর্মকর্তার ছেলের এমন বিলাসী জীবনযাপন সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। কাকতালীয়ভাবে সে সময় দেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলছিল। এই একটি ভাইরাল ছবি সাধারণ মানুষকে রাজপথে নামতে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করে, যা শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এই ঘটনার জের ধরে মতিউর রহমানের দুর্নীতির বিশাল সাম্রাজ্য উন্মোচিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে পদত্যাগ করে পুরো পরিবারসহ জেলের ঘানি টানতে হয়।

ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরও এই প্রাণীটিকে ঘিরে বিতর্কের অবসান হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবন থেকে ছাগল চুরি করে খেয়ে ফেলার অভিযোগ ওঠে কয়েকজন ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে সেই ছাত্রনেতারা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিলে এই চুরির অপবাদ তাদের বিরুদ্ধে প্রচারণার বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। এরপর নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি তার মায়ের দেখানো পথেই হাঁটছেন। দেশের দিনাজপুর, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন এবং স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে তিনিও ব্যাপকভাবে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বিতরণ কর্মসূচি শুরু করেছেন। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব উদ্যোগ নিয়ে প্রতিনিয়ত ট্রল ও আলোচনা চলছে। এমনকি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর জন্য এক বিএনপি সমর্থক ছাগল উপহার নিয়ে এসে প্রত্যাখ্যাত হলেও নেট দুনিয়ায় ঠিকই ভাইরাল হয়ে গেছেন।

রাজনীতির বাইরে অর্থনীতিতেও এর ব্যাপক অবদান রয়েছে। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে ব্র্যাক বা আশার মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করে, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করতে এবং নারীর ক্ষমতায়নে এই ক্ষুদ্র বিনিয়োগের রিটার্ন অনেক বেশি। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকও সম্প্রতি এই খাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে, আমাদের দৈনন্দিন আলাপের নানা প্রবাদ থেকে শুরু করে অপরের খেত নষ্ট করার অপরাধে থানায় বা ইউএনও অফিসে ছাগল আটকে রাখার মতো ঘটনাও নিত্যদিনের খবরে পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছাগল শুধু একটি নিরীহ প্রাণী নয়; বরং এটি রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল, দারিদ্র্য বিমোচন এবং রাতারাতি ভাইরাল হওয়ার এক অনন্য হাতিয়ার ও প্রতীক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category