• রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২১ পূর্বাহ্ন
Headline
চাকরি, টিউশনি ও সঙ্গীত পেশা: শিক্ষক ও শিল্পীর কর নির্ধারণে নতুন নির্দেশিকা টেকনাফে সশস্ত্র মানব পাচারকারীদের বন্দিশালা: পাহাড়ের গহিনে যমদূত সড়ক দুর্ঘটনায় সৌদি আরবে নারী-শিশুসহ ৭ বাংলাদেশি নিহত এনআইসিইউ ওভারহিট হয়ে নবজাতক দগ্ধ প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে ৩০ কোটি ডলার দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক বিনা খরচে মালয়েশিয়ায় ১১২ দক্ষ কর্মী পাঠাচ্ছে বোয়েসেল রবি মৌসুমে ১৪ লাখ ৬০ হাজার কৃষক পাবেন প্রণোদনা, বরাদ্দ প্রায় ৯৬ কোটি টাকা যে কারণে বাতিল হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা, জানাল দূতাবাস নারীর ক্ষমতায়নে উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিতে হবে: শামা ওবায়েদ জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা

চাকরি, টিউশনি ও সঙ্গীত পেশা: শিক্ষক ও শিল্পীর কর নির্ধারণে নতুন নির্দেশিকা

Reporter Name / ০ Time View
Update : রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬

দেশের কর ব্যবস্থাপনাকে সাধারণ করদাতাদের কাছে সহজবোধ্য ও স্বচ্ছ করতে প্রতি বছরই বিশদ উদাহরণসহ নির্দেশিকা প্রকাশ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর। ২০২৬-২৭ করবর্ষের জন্য প্রকাশিত সর্বশেষ আয়কর নির্দেশিকায় বহুমুখী আয়ের উৎস থাকা সত্ত্বেও কীভাবে একজন করদাতা আইনসম্মতভাবে আয়কর হিসাব করবেন, তার দুটি বাস্তবসম্মত ও চমৎকার দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়েছে। এর একটিতে বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের চাকরি, ব্যক্তিগত টিউশনি, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ ও লটারির আয়ের জটিল কর নির্ধারণ দেখানো হয়েছে। অন্যটিতে তুলে ধরা হয়েছে একজন পেশাদার সঙ্গীতশিল্পীর সঙ্গীত পরিবেশনা থেকে অর্জিত আয় এবং সংশ্লিষ্ট দলগত ব্যয় বাদ দিয়ে প্রকৃত নিট আয়ের ওপর কর নিরূপণের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া।

প্রথম দৃষ্টান্তটিতে ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌফিকুর রহমানের আর্থিক বছরের সামগ্রিক আয় ও ব্যয়ের নিখুঁত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত আয়বর্ষে তৌফিকুর রহমান তাঁর মূল শিক্ষকতার চাকরি থেকে মোট প্রাপ্তি হিসেবে পেয়েছেন সাত লাখ ৮০ হাজার টাকা। এই মোট প্রাপ্তির মধ্যে তাঁর মূল বেতন ছিল মাসিক ৪০ হাজার টাকা হিসেবে বছরে চার লাখ ৮০ হাজার টাকা। এছাড়া তিনি বছরজুড়ে বাড়িভাড়া ভাতা হিসেবে এক লাখ ৮৬ হাজার টাকা, চিকিৎসা ভাতা বাবদ ২৪ হাজার টাকা, দুটি ধর্মীয় উৎসবের বোনাস হিসেবে ৮০ হাজার টাকা এবং বাংলা নববর্ষের বিশেষ উৎসব ভাতা বাবদ ১০ হাজার টাকা গ্রহণ করেছেন।

আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী একজন চাকরিজীবীর মোট প্রাপ্ত বেতনের সম্পূর্ণ অংশ কিন্তু করযোগ্য আয় হিসেবে গণ্য হয় না। নির্দেশিকায় অনুসৃত নিয়ম অনুযায়ী, চাকরি থেকে মোট প্রাপ্তির এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ দুই লাখ ৬০ হাজার টাকা অথবা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা—এই দুই অঙ্কের মধ্যে যেটি অপেক্ষাকৃত কম, তা করমুক্ত সুবিধা হিসেবে বাদ দেওয়া হয়। তৌফিকুর রহমানের ক্ষেত্রে দুই লাখ ৬০ হাজার টাকার অঙ্কটি কম হওয়ায় তাঁর মূল প্রাপ্তি সাত লাখ ৮০ হাজার টাকা থেকে তা বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে শিক্ষকতা বা চাকরি খাত থেকে তাঁর চূড়ান্ত করযোগ্য আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ২০ হাজার টাকা।

তবে তৌফিকুর রহমানের আয়ের পরিধি কেবল বিদ্যালয়ের নির্ধারিত বেতনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি অবসর সময়ে নিজ বাসায় বাণিজ্যিকভাবে চারটি পৃথক ব্যাচে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতেন। প্রতিটি ব্যাচে আটজন করে মোট বত্রিশজন শিক্ষার্থীকে তিনি নিয়মিত পড়াতেন এবং প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রতি মাসে চার হাজার টাকা করে সম্মানীর অর্থ গ্রহণ করতেন। সেই হিসাবে টিউশনি খাত থেকে তাঁর মাসিক আয় হতো এক লাখ ২৮ হাজার টাকা এবং বছর শেষে এই টিউশনি থেকেই তাঁর মোট আয় দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকা। ফলে চাকরি খাতের পাঁচ লাখ ২০ হাজার এবং গৃহশিক্ষকতার ১৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকা যোগ করে ওই আয়বর্ষে তাঁর সর্বমোট করযোগ্য আয় দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।

২০২৬-২৭ করবর্ষের নির্ধারিত সাধারণ করহার কাঠামো অনুযায়ী এই বিশাল অঙ্কের আয়ের ওপর ধাপে ধাপে কর নির্ধারণ করা হয়েছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, মোট আয়ের প্রথম চার লাখ টাকা পর্যন্ত কোনো প্রকার কর দিতে হয় না অর্থাৎ করের হার শূন্য শতাংশ। পরবর্তী তিন লাখ টাকা আয়ের ওপর ১০ শতাংশ হারে করের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ হাজার টাকা। এর পরবর্তী চার লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর ধার্য হয় ৬০ হাজার টাকা এবং পরবর্তী পাঁচ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ হারে কর আসে এক লাখ টাকা। এই ধাপগুলো অতিক্রম করার পর অবশিষ্ট যে চার লাখ ৫৬ হাজার টাকা থাকে, তার ওপর সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ হারে কর দাঁড়ায় এক লাখ ১৪ হাজার টাকা। ফলে কোনো প্রকার রেয়াত বিবেচনা করার পূর্বে তৌফিকুর রহমানের মোট প্রদেয় আয়করের পরিমাণ দাঁড়ায় তিন লাখ চার হাজার টাকা।

তবে দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে সরকার বৈধ বিনিয়োগের বিপরীতে যে কর রেয়াতের সুবিধা প্রদান করে, শিক্ষক তৌফিকুর রহমানও সেই সুযোগ গ্রহণ করেছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট ২০২৫-২৬ আয়বর্ষে রাষ্ট্রীয় সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের মাধ্যমে চার লাখ টাকা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করেছিলেন। আয়কর নির্দেশিকায় প্রদর্শিত তিনটি অনুমোদিত সীমার মধ্যে সর্বনিম্ন অঙ্ক হিসেবে তাঁর অনুকূলে মোট ৪০ হাজার টাকার কর রেয়াত অনুমোদন করা হয়েছে। এই রেয়াতের অর্থ মূল নির্ধারিত কর তিন লাখ চার হাজার টাকা থেকে সরাসরি বাদ দেওয়ার পর তাঁর প্রকৃত আয়করের দায় দাঁড়ায় দুই লাখ ৬৪ হাজার টাকা।

কিন্তু গল্পের এখানেই সমাপ্তি নয়, কারণ বড় অঙ্কের নিট সম্পদের মালিকদের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়মে সারচার্জ আরোপের বিধান রয়েছে। ২০২৬ সালের ৩০ জুন তারিখে সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী শিক্ষক তৌফিকুর রহমানের নিট সম্পদের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল চার কোটি ৪০ লাখ টাকা। আয়কর নির্দেশিকায় নির্ধারিত চার কোটি টাকার সাধারণ সীমা অতিক্রম করায় তাঁর ওপর অতিরিক্ত ১০ শতাংশ হারে সম্পদ সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে। এই সারচার্জের হিসাব করা হয়েছে রেয়াতপূর্ব মূল কর তিন লাখ চার হাজার টাকার ওপর, যার ১০ শতাংশ হিসেবে অতিরিক্ত ৩০ হাজার ৪০০ টাকা যুক্ত হয়েছে। ফলে রেয়াত-পরবর্তী আয়কর দুই লাখ ৬৪ হাজার এবং সারচার্জ ৩০ হাজার ৪০০ টাকা মিলিয়ে তাঁর মোট প্রদেয় করের পরিমাণ দাঁড়ায় দুই লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ টাকা।

লটারির অর্থ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আয়কর নির্দেশিকা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ের ব্যবধানের বিষয়টিও স্পষ্ট করেছে। তৌফিকুর রহমান ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই লটারির মাধ্যমে পুরস্কার হিসেবে এককালীন ১০ লাখ টাকা অর্জন করেন। এই অর্থ পাওয়ার সময় ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরকারি নিয়মে ২৫ শতাংশ হারে আড়াই লাখ টাকা উৎসে কর হিসেবে আগেই কেটে রেখেছিল। তবে যেহেতু এই লটারির অর্থ ২০২৬ সালের ৩০ জুনের পরে অর্জিত হয়েছে, তাই এটি ২০২৬-২৭ আয়বর্ষের আয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং তা পরবর্তী ২০২৭-২৮ করবর্ষের আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শন করে সমন্বয় করতে হবে। অর্থাৎ আয় অর্জনের সুনির্দিষ্ট তারিখ এবং তা করবর্ষে প্রদর্শনের সময়ের পার্থক্য করদাতাদের খুব সতর্কভাবে খেয়াল রাখতে হবে।

দ্বিতীয় দৃষ্টান্তে নির্দেশিকায় তুলে ধরা হয়েছে পেশাদার সঙ্গীতশিল্পী সঞ্চারী চক্রবর্তীর আয় ও ব্যয়ের এক চমৎকার বাস্তব হিসাব। পেশাদার সঙ্গীত পরিবেশন করে যারা জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের ক্ষেত্রেও আয়কর আইন সমানভাবে প্রযোজ্য। তবে চাকরিজীবীদের চেয়ে পেশাদার শিল্পীদের কর হিসাবের সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হলো, তাদের মোট আয় থেকে পেশাগত কাজের জন্য অপরিহার্য ও প্রমাণযোগ্য যাবতীয় ব্যয় সরাসরি বাদ দিয়ে নিট করযোগ্য আয় নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে। ময়মনসিংহে নিজস্ব সঙ্গীত দল পরিচালনা করা এই কণ্ঠশিল্পী ২০২৫-২৬ আয়বর্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠান করে সর্বমোট ১৮ লাখ টাকা আয় করেছিলেন।

সঞ্চারী চক্রবর্তীর পুরো সঙ্গীত দলে মোট আটজন নিয়মিত সহযোগী ছিলেন, যাদের সার্বক্ষণিক পারিশ্রমিক দিতে হয়েছিল। এদের মধ্যে তিনজন সহশিল্পীকে মাসিক ১২ হাজার টাকা করে বছরে মোট চার লাখ ৩২ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। তিনজন যন্ত্রশিল্পীকে মাসিক ১০ হাজার টাকা হিসেবে বছরে তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং দুজন দক্ষ তবলাবাদককে মাসে আট হাজার টাকা করে বছরে এক লাখ ৯২ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পরিশোধ করা হয়েছে। অর্থাৎ সঙ্গীত দলের আটজন সদস্যের বেতন বাবদই তাঁর বার্ষিক খরচ হয়েছে নয় লাখ ৮৪ হাজার টাকা। এছাড়া শিল্পীদের জন্য বিশেষ পোশাক তৈরিতে ১৫ হাজার এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দলের যাতায়াত ভাড়া বাবদ নয় হাজার টাকাসহ মোট পেশাগত ব্যয় দাঁড়ায় ১০ লাখ আট হাজার টাকা।

অনুষ্ঠান থেকে অর্জিত মোট ১৮ লাখ টাকা থেকে অনুমোদিত পেশাগত ব্যয় ১০ লাখ আট হাজার টাকা বাদ দেওয়ার পর কণ্ঠশিল্পী সঞ্চারী চক্রবর্তীর প্রকৃত নিট আয় দাঁড়ায় সাত লাখ ৯২ হাজার টাকা। একজন নারী করদাতা হিসেবে তাঁর জন্য করমুক্ত আয়ের সাধারণ সীমা ছিল চার লাখ ৫০ হাজার টাকা। ফলে তাঁর ক্ষেত্রে প্রথম চার লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত কোনো কর প্রযোজ্য হয়নি। পরবর্তী তিন লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে ৩০ হাজার টাকা এবং অবশিষ্ট ৪২ হাজার টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ছয় হাজার ৩০০ টাকা কর ধার্য করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সঞ্চারী চক্রবর্তীর চূড়ান্ত প্রদেয় কর দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৬ হাজার ৩০০ টাকা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এই বিশদ দুটি উদাহরণ বিশ্লেষণ করলে এটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে আয়ের প্রতিটি পৃথক খাতকে কর আইনে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করা হয়। শিক্ষকতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত কোচিং বা টিউশনির আয় যেমন করের আওতায় আসে, তেমনই শিল্পীদের ক্ষেত্রে দল পরিচালনার বাস্তব ব্যয় বাদ দিয়ে নিট আয়ের ওপর কর ধার্য করা হয়। উপযুক্ত কাগজপত্র ও রসিদ সংরক্ষণ করার মাধ্যমে একজন সচেতন নাগরিক যেমন আইনসম্মতভাবে কর রেয়াত ও ব্যয়ের সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন, তেমনই সময়মতো সঠিক করবর্ষে রিটার্ন দাখিল করে আইনি জটিলতা থেকেও সম্পূর্ণ মুক্ত থাকতে পারেন।

তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category