ভোরের স্নিগ্ধ আলো আর এস্রাজ-সেতারের সুরে নতুন বছর ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিল বাঙালি। অশুভ শক্তির বিনাশ আর মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে রাজধানীর রমনা বটমূল থেকে শুরু করে চারুকলা চত্বর— সর্বত্রই এখন উৎসবের আমেজ। ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’— বিশ্বকবির এই অমর পঙক্তিকে প্রতিপাদ্য করে এবার নতুন বছরকে আবাহন জানাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট।
ভোর ৬টা ১৫ মিনিটে সম্মেলক কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানটির মাধ্যমে শুরু হয় ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। প্রায় দুই শতাধিক শিল্পী, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে রমনার বটমূল পরিণত হয় এক বিশাল সুরের কাননে। এবারের অনুষ্ঠানে মোট ২২টি গান পরিবেশিত হচ্ছে, যার মধ্যে ৮টি সম্মেলক এবং ১৪টি একক গান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে লালন সাঁই ও দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গানে ফুটে উঠছে বাঙালির আত্মপরিচয়।
১৯৬৭ সাল থেকে ছায়ানট যে ঐতিহ্যের সূচনা করেছিল, আজ তা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির এক অভিন্ন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। বটমূলের এই আয়োজনে অংশ নেওয়া সাধারণ দর্শনার্থীদের মতে, এটি কেবল একটি উৎসব নয়, বরং বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ।
সকাল হতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হয়েছে বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা। এবারের শোভাযাত্রার মূল আকর্ষণ পাঁচটি বিশেষ মোটিফ:
মোরগ ও ঘোড়া: গতিশীলতা ও শক্তির প্রতীক।
বেহালা: বাঙালির সৃজনশীলতার পরিচয়।
পায়রা: শান্তির বার্তা।
হাতি: গৌরবের প্রতীক।
বাঁশ, কাঠ আর রঙিন কাগজে নির্মিত এই বিশাল প্রতিকৃতিগুলো নিয়ে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী জাতীয় পতাকা হাতে শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছেন। ৩৫ জন যন্ত্রশিল্পীর বাঁশি ও দোতারার সুরে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠেছে ‘এসো হে বৈশাখ’ গানে।
রাজধানীর পাশাপাশি সারা দেশেই পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হচ্ছে বর্ণিল আয়োজনে। পুরোনো বছরের সব গ্লানি ও ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে নতুন সম্ভাবনা আর সুন্দর আগামীর স্বপ্নে বিভোর আপামর জনতা। বাঙালির এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আবারও প্রমাণ করল— শিল্প ও সংস্কৃতির পথ ধরেই আসে মুক্তি।