দীর্ঘ কয়েক দশকের বৈরিতার পর ২০২৬ সালে এসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এক অলিখিত যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি অনুযায়ী, সরাসরি ইরানি ভূখণ্ডে বড় ধরনের স্থল অভিযান চালানোর চেয়ে ‘অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবরোধ’ অনেক বেশি কার্যকর। আর এই কৌশলের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো হরমুজ প্রণালি। কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র এই বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম নৌপথ অবরুদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে, তার পর্যায়ক্রমিক বিশ্লেষণ এখানে দেওয়া হলো।
ঐতিহাসিকভাবে একটি অবরোধ মানেই ছিল শত্রু দেশের উপকূলে রণতরি নিয়ে অবস্থান করা। কিন্তু ইরানের হাতে বর্তমানে রয়েছে শক্তিশালী ড্রোন বাহিনী এবং অত্যাধুনিক অ্যান্টি-শিপ ব্যালিস্টিক মিসাইল সিস্টেম। সালভাতোর মার্কোগ্লিয়ানোর মতে, যুক্তরাষ্ট্র এবার ‘ডিস্ট্যান্ট ব্লকেড’ বা দূরবর্তী অবরোধের নীতি গ্রহণ করছে।
কেন এই দূরত্ব? মার্কিন রণতরিগুলো সরাসরি ইরানের উপকূলীয় কামানের আওতায় আসবে না। তারা ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের একটি নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে প্রণালি থেকে বেরিয়ে আসা জাহাজগুলোকে পর্যবেক্ষণ করবে।
কার্যপদ্ধতি: মার্কিন নৌবাহিনী জাহাজগুলোকে থামিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ‘রেডিও সিগন্যাল’ এবং ‘ওয়ার্নিং শট’-এর মাধ্যমে তাদের গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করবে। যদি কোনো জাহাজ নির্দেশ অমান্য করে, তবেই কেবল কমান্ডো অভিযানের মাধ্যমে সেটিকে জব্দ করার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধের লক্ষ্য ঢালাওভাবে সব দেশ নয়। ওয়াশিংটন চায় বিশ্বজুড়ে তাদের ‘ভিলেন’ ইমেজের পরিবর্তে কেবল ইরানের ওপর চাপ তৈরি করতে।
টার্গেট লিস্ট: সেন্টকমের নির্দেশনা অনুযায়ী, অবরোধের মূল লক্ষ্য হবে ইরান সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজ এবং যে জাহাজগুলো সরাসরি ইরানের বন্দর থেকে পণ্য বা তেল নিয়ে বের হচ্ছে।
মানবিক ছাড়: ওষুধ, খাদ্য বা অন্যান্য জরুরি মানবিক সহায়তা বহনকারী জাহাজগুলোকে এই অবরোধের আওতামুক্ত রাখা হবে। এছাড়া সৌদি আরব, কুয়েত বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মিত্র দেশগুলোর জাহাজ চলাচলে কোনো বাধা দেবে না ওয়াশিংটন। এটি মূলত ইরানকে কূটনৈতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করার একটি প্রয়াস।
অবরোধ সফল করতে পেন্টাগন বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় তাদের নৌ-শক্তির ব্যাপক সংহতি ঘটিয়েছে। সালভাতোর মার্কোগ্লিয়ানোর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে তিনটি প্রধান শক্তির কথা:
উন্নত রাডার ও স্যাটেলাইট: জিপিএস এবং উন্নত রাডার প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রণালির প্রতিটি বর্গফুট ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কোনো জাহাজ যেন ‘ট্রান্সপন্ডার’ বন্ধ করে দিয়ে অন্ধকার পথে পাড়ি দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করছে নজরদারি বিমানগুলো।
ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ: ওমান উপসাগরে অবস্থানরত মার্কিন বিমানবাহী রণতরিগুলো থেকে দ্রুতগামী যুদ্ধবিমান ও ড্রোন সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছে।
আঞ্চলিক মিত্রদের বন্দর: বাহরাইন এবং কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো এই অবরোধের লজিস্টিক সাপোর্ট হিসেবে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন অবরোধের ছক কষছে, ইরানও তখন পাল্টা প্রস্তুতির কথা জানিয়ে রেখেছে। ইতিহাসবিদরা একে বলছেন ‘ডাবল ব্লকেড’।
ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ: ইরান যদি তাদের নিজেদের নৌ-সীমানায় মার্কিন জাহাজ বা মিত্র দেশগুলোর জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়, তবে পুরো হরমুজ প্রণালি এক ‘ডেড লকে’ পরিণত হবে।
নৌ-মাইন: ইরানের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র হলো নৌ-মাইন। তারা যদি প্রণালির সরু পথে মাইন ছড়িয়ে দেয়, তবে মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য এই রুট পুনরায় পরিষ্কার করা হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ কাজ।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০%) সরবরাহ করা হয়। এই অবরোধ সফল বা ব্যর্থ যেটাই হোক না কেন, এর প্রথম শিকার হবে বৈশ্বিক বাজার।
তেলের মূল্য বৃদ্ধি: সরবরাহ চেইন সামান্য বিঘ্নিত হলেও প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১৫০ ডলার থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সেমিকন্ডাক্টর ও সার সংকট: হিলিয়ামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল এই রুট দিয়েই সরবরাহ হয়। ফলে টেক-ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে কৃষি খাত—সবই সংকটে পড়বে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ৩.৩ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও এই অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা দুই অংকের ঘরে পৌঁছাতে পারে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক জনমত। ন্যাটোর মতো অনেক মিত্র দেশ ইরানের সঙ্গে সরাসরি এই সামরিক উত্তেজনায় জড়াতে অনীহা দেখাচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদী বৈশ্বিক মন্দার সূচনা করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ইরানকে পঙ্গু করে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা। তবে জেডি ভ্যান্সের সাম্প্রতিক বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর এবং ট্রাম্পের ‘বিজয়’ দাবির মাঝে কোনো পক্ষই নতি স্বীকার করতে রাজি নয়। সালভাতোর মার্কোগ্লিয়ানোর মতে, এই সামুদ্রিক স্নায়ুযুদ্ধ যেকোনো মুহূর্তে আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হতে পারে।
হরমুজ প্রণালি কি উন্মুক্ত হবে, নাকি এটি ২০২৬ সালের নতুন এক বৈশ্বিক মহামন্দার কারণ হবে—তা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ থেকেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।