• শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ০৪:১৭ অপরাহ্ন

চীন সফরে নতুন উচ্চতায় বাংলাদেশ ও বেইজিং সম্পর্ক

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বেইজিং সফর বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে তিনি কেবল দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির অঙ্গীকারই করেননি, বরং অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার রূপরেখা তৈরি করেছেন। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এই সফরের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সমঝোতাগুলো কেবল অবকাঠামো উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিনিয়োগ সহায়তা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং গণমাধ্যম সহযোগিতার মতো বহুমুখী খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনাকে আরও বেগবান করবে।

সফরের দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ সেমিনারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, তার সরকার চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সহজ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে, চীনা বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজতর করার লক্ষ্যে দেশটিতে বাংলাদেশের প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ খোলার ঘোষণা ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ। প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত চীনের ১২৫ জন শীর্ষ ব্যবসায়ীর মাঝে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। তিনি জানিয়েছেন, চট্টগ্রামের আনোয়ারা এবং মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ ও কারখানা স্থাপনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে সরকার ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন কারখানা স্থাপিত হলে কেবল রপ্তানি আয়ই বাড়বে না, বরং দেশের হাজার হাজার বেকার যুবকের জন্য তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান।

১৩টি সমঝোতা স্মারকের বিশদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ এবার কেবল ঋণনির্ভর প্রকল্পের পরিবর্তে দক্ষতা ও প্রযুক্তিভিত্তিক অংশীদারিত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। চুক্তির আওতায় চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ বা ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (জিডিআই)-এ বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। এর ফলে দারিদ্র্য বিমোচন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চীন থেকে নতুন ধরনের উন্নয়ন সহায়তা পাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে। এছাড়া কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষার প্রসারে গৃহীত কর্মপরিকল্পনা বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ এবং পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে প্রযুক্তি হস্তান্তরের চুক্তিগুলো ভবিষ্যতের স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথে মাইলফলক হয়ে থাকবে।

সাংস্কৃতিক ও তথ্যগত আদান-প্রদানকে গুরুত্ব দিয়ে গণমাধ্যমের নানা পরিসরে সহযোগিতার চুক্তিগুলো দুই দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও গভীর করবে। চীনা ভাষা শিক্ষা প্রসারে গৃহীত পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে চীনের উন্নত প্রযুক্তির শিক্ষা ও গবেষণায় আরও সহজে সম্পৃক্ত হতে পারবে। পাশাপাশি ভূতাত্ত্বিক জরিপ ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে চীনের আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশের ভূ-গর্ভস্থ সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব নির্ধারণ সহজ হবে। এই বিস্তৃত সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ ও চীন কেবল উন্নয়ন সহযোগী নয়, বরং একে অপরের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত অংশীদার হিসেবে এগিয়ে যেতে চায়।

সফরের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনের কারিগরি সহযোগিতা। চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইংয়ের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীশাসন ও পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের নদী খনন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীন সরকারের কারিগরি সহায়তার প্রত্যাশায় বেইজিংয়ের ইতিবাচক সাড়া উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকায় এক বিশাল স্বস্তি নিয়ে আসবে। দীর্ঘদিনের খরা ও বন্যার করাল গ্রাস থেকে তিস্তাপাড়ের জনপদকে রক্ষা করতে এই মহাপরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে তা হবে বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য।

এবারের সফরে রাজনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক অভিনব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যকার সমঝোতা স্মারক। দুই দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে এমন সরাসরি যোগাযোগ ও সহযোগিতার দলিল স্বাক্ষর আগে কখনও দেখা যায়নি। বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘দিয়াওইউতাই’-এ স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা কেবল দুই দলের সম্পর্ককেই উষ্ণ করেনি, বরং ভবিষ্যতে দুই দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে আরও স্থিতিশীল ও গবেষণানির্ভর করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। সিপিসির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক ও বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে চীনের অব্যাহত সমর্থনের নিশ্চয়তা এই সফরের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গ্রেট হলে যে রাজকীয় লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে, তা বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রতি গভীর আস্থার বহিঃপ্রকাশ। দুই দেশের জাতীয় সংগীতের সুর ও সশস্ত্র বাহিনীর চৌকস দলের অভিবাদন এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে নৈশভোজ—এই সব আয়োজনই প্রমাণ করে যে, চীন বাংলাদেশকে তাদের আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখছে। বেইজিং সফরের পুরো সময় জুড়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিটি কার্যক্রমে অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির বার্তাটি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তিনি যেখানেই গেছেন, সেখানেই চীনের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন এবং সরকারি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে তার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

সফরের শেষ পর্যায়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন যুগে প্রবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রতি চীনের অবিচল সমর্থনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। দুই নেতার একান্ত বৈঠকের মাধ্যমে ‘নতুন যুগের চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়’ গড়ে তোলার যে সিদ্ধান্ত এসেছে, তা আগামী কয়েক দশকে দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণ এবং পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত সংলাপ চালুর প্রস্তাবগুলো দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

পরিশেষে বলা যায়, তারেক রহমানের এই রাষ্ট্রীয় সফর কেবল কিছু চুক্তি বা সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের জন্য এক নতুন আত্মবিশ্বাসী যাত্রার সূচনা। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ার সফল সফরের পরপরই চীনের এই সফরটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ এখন একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় এই সফর থেকে পাওয়া প্রাপ্তিগুলো আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সহায়ক হবে। সরকার ও জনগণের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরির পাশাপাশি চীনের মতো অর্থনৈতিক পরাশক্তির সঙ্গে এই গভীর অংশীদারিত্ব প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নের মহাসড়কে অত্যন্ত সতর্ক ও কৌশলী অবস্থানে রয়েছে। এই ১৩টি সমঝোতা স্মারক কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে যদি জনগণের সুফল নিশ্চিত করা যায়, তবেই এই সফর থেকে অর্জিত সাফল্য ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী হয়ে থাকবে। উত্তরের মানুষের প্রাণের দাবি তিস্তা থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে যে উন্নয়নের স্বপ্ন এখন দৃশ্যমান, সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মূল চাবিকাঠি এখন এই চীন সফরের সফল বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category