• শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ০৪:৩৬ অপরাহ্ন

শুক্রাণু বাড়াতে অনলাইনে ভাইরাল ‘পদ্ধতি’ কতটা নিরাপদ? চিকিৎসকরা যা বলছেন

Reporter Name / ০ Time View
Update : শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

বর্তমান সময়ে টিকটক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরুষদের উর্বরতা বা শুক্রাণু বাড়াতে নানা ধরনের অদ্ভুত সব ‘পদ্ধতি’ ভাইরাল হচ্ছে। অণ্ডকোষে বরফ রাখা, রেড লাইট থেরাপি কিংবা ঘরোয়া সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের মতো এসব পরামর্শের ভিডিওগুলো এখন শত কোটি ভিউ পাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এসব রুটিন কতটা কার্যকর? নাকি এগুলো কেবলই ইন্টারনেটের গালগল্প, যা পুরুষদের স্বাস্থ্যের জন্য ডেকে আনছে নতুন বিপদ?

ভাইরাল সব পদ্ধতির আড়ালে ঝুঁকি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়া পুরুষদের প্রজনন ক্ষমতা বাড়ানোর একটি অন্যতম আলোচিত পদ্ধতি হলো ‘চিল নাটস’ বা অণ্ডকোষে বরফের প্যাক ব্যবহার করা। অনেক ইনফ্লুয়েন্সার দাবি করেন, এর ফলে শুক্রাণুর কার্যকারিতা বাড়ে। এছাড়া অণ্ডকোষের সামনে রেড লাইট থেরাপি ব্যবহারের প্রবণতাও বেশ উদ্বেগজনক। তবে প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব পদ্ধতির সপক্ষে চিকিৎসা বিজ্ঞানে কোনো জোরালো প্রমাণ নেই। বরং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অণ্ডকোষের মতো স্পর্শকাতর স্থানে মাত্রাতিরিক্ত তাপমাত্রা বা আলোর বিকিরণ ব্যবহার করা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সাপ্লিমেন্ট ও স্টেরয়েডের মরণফাঁদ

উর্বরতা বৃদ্ধির নামে অনলাইনে বিভিন্ন ওষুধের ‘স্ট্যাক’ বা সেট বিক্রির একটি শিল্প গড়ে উঠেছে। বডিবিল্ডিং বা চেহারা উন্নত করার নেশায় অনেক পুরুষ টেস্টোস্টেরন ও স্টেরয়েড ব্যবহার করছেন, যা প্রকৃতপক্ষে তাদের উর্বরতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ইনফ্লুয়েন্সাররা এইচসিজি (HCG) বা এইচএমজি (HMG)-এর মতো শক্তিশালী হরমোন ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া এসব ওষুধ গ্রহণ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি রক্ত জমাট বাঁধা, স্তন বৃদ্ধি, এমনকি প্রজননতন্ত্রের স্থায়ী বিকৃতির কারণ হতে পারে।

উদ্বেগের পেছনে কি সত্যি সংকট আছে?

বিশ্বব্যাপী শুক্রাণু সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, এটি সত্য। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সংকটকে অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রজনন এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট অধ্যাপক চান্না জায়াসেনা জানান, জন্মহার কমার পেছনে জৈবিক সমস্যার চেয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলোই মুখ্য। অথচ ইনফ্লুয়েন্সাররা এসব জটিল সামাজিক বিষয়গুলোকে এড়িয়ে গিয়ে কেবল ‘মহামারি’ আতঙ্ক ছড়িয়ে নিজের পণ্য বিক্রিতে ব্যস্ত। তাদের অতিরঞ্জিত দাবির কারণে অনেকে ভয়ের বশবর্তী হয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার বদলে ভুল পথে পা বাড়াচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: যা করণীয়

উর্বরতা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুক্স মিনহাস জানান, পুরুষদের বন্ধ্যাত্ব নিয়ে সচেতনতা অবশ্যই ইতিবাচক, কিন্তু এর নামে অপ্রয়োজনীয় উদ্বেগ বাড়ানো ক্ষতিকর। তিনি বলেন, “সবচেয়ে ভালো হলে এসব পদ্ধতি মানুষকে প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বিভ্রান্ত করে, আর সবচেয়ে খারাপ হলে তাদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ফেলে।”

চিকিৎসকদের মতে, উর্বরতা নিয়ে কোনো উদ্বেগ থাকলে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:

  • পেশাদার পরামর্শ: কোনো ইনফ্লুয়েন্সার বা ইউটিউবারের পরামর্শে ওষুধ না খেয়ে সরাসরি একজন ইউরোলজিস্ট বা ফার্টিলিটি স্পেশালিস্টের সাথে যোগাযোগ করুন।

  • বীর্য পরীক্ষা: যদি উর্বরতা নিয়ে উদ্বেগ থাকে, তবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ‘সিমেন অ্যানালাইসিস’ বা বীর্য পরীক্ষা করান। এটি আপনার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেবে।

  • জীবনযাত্রায় পরিবর্তন: রেড লাইট বা বরফের চেয়ে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত ব্যায়াম উর্বরতা রক্ষায় বেশি কার্যকর।

  • স্টেরয়েড বর্জন: পেশী গঠনের জন্য স্টেরয়েড বা টেস্টোস্টেরন ইনজেকশন নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। এটি প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করার জন্য দায়ী অন্যতম বড় কারণ।

শেষ পর্যন্ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা কোনো পদ্ধতিই একজন চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প হতে পারে না। প্রজনন স্বাস্থ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়; তাই ইন্টারনেটের ‘ভাইরাল’ পরামর্শে কান না দিয়ে বৈজ্ঞানিক এবং চিকিৎসকের নির্দেশিত পথে চলাটাই বুদ্ধিমত্তার কাজ। মনে রাখবেন, ভুল ওষুধ বা অপ্রমাণিত থেরাপি আপনার সাময়িক উর্বরতা বাড়ানোর বদলে স্থায়ী ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category