দীর্ঘ চিকিৎসার লড়াই শেষে জন্মভূমিতে ফিরেছে জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর, অভিনেত্রী ও চিত্রনাট্যকার কারিনা কায়সারের নিথর দেহ। রোববার (১৭ মে) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তাঁর মরদেহ দেশে পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিমানবন্দরে মেয়ের লাশ গ্রহণ করেন তাঁর বাবা, বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক ও কিংবদন্তি ডিফেন্ডার কায়সার হামিদ। এরপর লাশবাহী গাড়ি বনানীর বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়। মাত্র ৩০ বছর বয়সে অকাল প্রয়াত এই তরুণ প্রতিভাকে একনজর দেখতে স্বজন, সহকর্মী ও ভক্তরা সেখানে ভিড় জমান।
পারিবারিক ও হাসপাতাল সূত্র থেকে জানা যায়, কয়েক দিন আগে প্রথমে সাধারণ জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন কারিনা। কিন্তু পরবর্তীতে তাঁর শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ ধরা পড়ে। হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’ ভাইরাসের যৌথ সংক্রমণে তাঁর লিভারের কার্যক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট (লিভার ফেইলিউর) হয়ে যায়। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় প্রথমে তাঁকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত সোমবার রাতে অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে ভারতের চেন্নাইয়ে নেওয়া হয়। সেখানে ভেলোরের বিখ্যাত খ্রিষ্টান মেডিক্যাল কলেজ (সিএমসি) হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। চিকিৎসকেরা প্রথমে ফুসফুসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি লিভার প্রতিস্থাপনের (লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট) প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে শুক্রবার দিবাগত মধ্যরাতে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। প্রখ্যাত ক্রীড়া সংগঠক এম এ হামিদ ও বরেণ্য দাবাড়ু রানী হামিদের নাতনি কারিনার এই অকাল মৃত্যুতে ক্রীড়া ও বিনোদন অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
দেশে মরদেহ পৌঁছানোর পর যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভালোবাসায় তাঁকে বিদায় জানানো হয়। বাদ মাগরিব রাজধানীর বনানীর ডিওএইচএস কেন্দ্রীয় মসজিদে কারিনার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং এরপর বাদ এশা বনানী দরবার শরিফে দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন হয়। রাতে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হলে সেখানে এক শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সহকর্মী, নির্মাতা ও অসংখ্য ভক্ত অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এরপর সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষে মুন্সিগঞ্জের আবদুল্লাহপুরে কারিনার মায়ের দেওয়া মসজিদের পাশে তাঁকে চিরতরে দাফন করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাণবন্ত উপস্থাপনা ও জীবনঘনিষ্ঠ কনটেন্ট দিয়ে তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন কারিনা। কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীতে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও নাটকের জগতেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্যকার হিসেবেও তাঁর বিশেষ পরিচিতি ছিল। চরকি অরিজিনাল সিরিজ ‘ইন্টার্নশিপ’ এবং ‘৩৬-২৪-৩৬’ চলচ্চিত্রে তাঁর অনবদ্য কাজ দর্শক ও সমালোচকদের কাছে দারুণ প্রশংসিত হয়েছিল। তাঁর এই অকাল প্রস্থান দেশের বিনোদন জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি করল।