মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশনায় ইরানে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের ৮০ দিন পর, যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মার্কিন সিনেট। মঙ্গলবার (১৯ মে) পাস হওয়া এই ‘ওয়ার পাওয়ার্স’ (যুদ্ধ-ক্ষমতা) প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো—কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া ইরান সংঘাত থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে প্রত্যাহার করতে প্রেসিডেন্টকে বাধ্য করা। নিজ দলের চারজন রিপাবলিকান সিনেটরের ট্রাম্পের বিপক্ষে ভোট দেওয়াকে প্রেসিডেন্টের জন্য একটি বিরল ও প্রকাশ্য রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে প্রস্তাবটি ৫০-৪৭ ভোটে পাস হয়। এই ভোটাভুটিতে দলীয় শৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে বেশ কয়েকজন আইনপ্রণেতা বিপরীতমুখী অবস্থান নেন:
ট্রাম্পের বিপক্ষে ৪ রিপাবলিকান: কেন্টাকির র্যান্ড পল, মেইনের সুসান কলিন্স, আলাস্কার লিসা মুরকোস্কি এবং লুইজিয়ানার বিল ক্যাসিডি দলীয় অবস্থান অগ্রাহ্য করে ডেমোক্র্যাটদের আনা যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন।
প্রস্তাবের বিপক্ষে ১ ডেমোক্র্যাট: পেনসিলভেনিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান নিজ দলের বাইরে গিয়ে এই প্রস্তাবের বিপক্ষে (অর্থাৎ ট্রাম্পের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে) ভোট দেন।
এ ছাড়া, তিনজন রিপাবলিকান সিনেটর ভোটদানে অনুপস্থিত ছিলেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে এক ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে এসেছে:
প্রাণহানি ও ক্ষতি: এখন পর্যন্ত ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোর শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
অর্থনৈতিক ধাক্কা: পেন্টাগনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এরই মধ্যে ২৯ বিলিয়ন (২ হাজার ৯০০ কোটি) ডলার ব্যয় হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ: বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনের রুট হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে সেখানে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানি জাহাজগুলো অবরোধ করে রেখেছে। এই পরিস্থিতির কারণে পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গেও ওয়াশিংটনের সম্পর্কে ফাটল ধরেছে।
ডেমোক্র্যাটরা সংবিধানে উল্লেখিত ‘ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট’-এর ওপর ভিত্তি করেই এই প্রস্তাবটি এনেছেন। এই আইন অনুযায়ী, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট একবারে ৬০ দিনের বেশি সময়ের জন্য বিদেশে সামরিক বাহিনী মোতায়েন রাখতে পারবেন না।
ডেমোক্র্যাটদের দাবি: ট্রাম্পের বিনা অনুমোদনে যুদ্ধ চালানোর সেই ৬০ দিনের আইনি সময়সীমা গত ১ মে শেষ হয়ে গেছে। ফলে তাকে অবিলম্বে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে।
হোয়াইট হাউসের যুক্তি: ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, গত ৮ এপ্রিল যখন যুদ্ধবিরতি ঘোষণার বিষয়টি আলোচনায় আসে, তখন থেকেই ‘ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট’-এর সময়সীমার ঘড়ি থমকে আছে। এর ফলে একতরফাভাবে বাহিনী মোতায়েন রাখার জন্য ট্রাম্পের হাতে এখনও অন্তত ৪০ দিন সময় অবশিষ্ট রয়েছে।
মঙ্গলবারের এই সিনেট ভোট ট্রাম্পের যুদ্ধ-নীতি সমালোচনাকারী আইনপ্রণেতাদের জন্য একটি বড় প্রতীকী বিজয় হলেও, এর মাধ্যমে এখনই মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার নিশ্চিত হচ্ছে না। সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, এটি মূলত একটি পদ্ধতিগত ভোট। ‘ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট’ চূড়ান্তভাবে কার্যকর করতে হলে এবং সম্ভাব্য প্রেসিডেন্সিয়াল ভেটো (Veto) বাতিল করতে হলে, ডেমোক্র্যাটদের সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদ—উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হবে, যা বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের যুগে অত্যন্ত কঠিন।
তবে সামরিক উত্তেজনার সমান্তরালে পর্দার আড়ালে কূটনীতির চাকাও সচল রয়েছে। যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে চলতি সপ্তাহেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে প্রস্তাব বিনিময়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। কংগ্রেসের এই চাপ শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনকে আলোচনার টেবিলে আরও নমনীয় হতে বাধ্য করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।