ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কের সাম্প্রতিক বরফশীতল অবস্থার পটভূমিতে একটি নজিরবিহীন ও কড়া কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া পুরো রাজনৈতিক ছক পাল্টে দিয়েছে। বাংলাদেশকে রাজনৈতিক চাপে রেখে ফায়দা লোটার উদ্দেশ্যে একটি সুনির্দিষ্ট নকশা প্রণয়ন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠলেও, শেষ পর্যন্ত ঢাকার দৃশ্যমান কঠোর অবস্থানের কারণে পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নিয়েছে। জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনটিতে দিল্লিতে আশ্রয়প্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলনের সুযোগ করে দেওয়ায় দুই দেশের সুসম্পর্কে তীব্র তিক্ততার জন্ম হয়। দিল্লির এমন কৌশল ঢাকাকে ক্ষুব্ধ ও স্তম্ভিত করলেও পরবর্তীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রচারিত একটি কঠোর ও সরাসরি ভাষার রাজনৈতিক বিবৃতি দিল্লির প্রশাসনিক মহলে চরম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
সংবাদ সম্মেলনটি আয়োজনের পূর্বে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন উচ্চপর্যায় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়ে দিল্লিকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিল। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়, চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণহত্যার দণ্ডে অভিযুক্ত একজন আসামিকে কোনো অবস্থাতেই সরকারি বা বেসরকারি মদতে সংবাদ সম্মেলন করতে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। এর জবাবে ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, আয়োজক সংস্থা ‘ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব’ একটি স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম এবং এতে সরকারের সরাসরি ভূমিকা নেই। তবে ঢাকাকে আশ্বস্ত করে বলা হয়েছিল যে উক্ত সম্মেলনে ভারতীয় কোনো সাংবাদিক প্রশ্ন করবেন না। কিন্তু বাস্তবে সংবাদ সম্মেলনটি ভারতীয় গণমাধ্যমকর্মীদের দ্বারা পরিচালিত একটি সরাসরি অনুষ্ঠানের মতো উপস্থাপিত হয়, যেখানে সাবেক আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ও অডিও মাধ্যমে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও মন্তব্য করেন।
এই পুরো ঘটনার ভিডিও ও তথ্যাদি ঢাকায় পৌঁছানোর পরপরই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা এক জরুরি ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হন। দেশের সার্বিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় চিরাচরিত মৃদু বা নমনীয় কূটনৈতিক ভাষার পরিবর্তে একটি অত্যন্ত কঠোর ও রাজনৈতিক বার্তা সংবলিত বিবৃতি প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয় যে, পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয় যে, বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীর মতো একটি ঐতিহাসিক দিনে ভারতীয় ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও তার জনগণের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ঘৃণা ছড়ানোর সুযোগ দেওয়া সরাসরি বাংলাদেশের সার্বিক সার্বভৌমত্বের ওপর চরম আঘাত এবং হাজারো শহীদের প্রতি চরম অবমাননা।
বিবৃতিতে দৃঢ়ভাবে পুনর্নোব্য করা হয় যে, জুলাই বিপ্লবের চেতনায় উদ্বুদ্ধ বাংলাদেশের জনগণ আর কখনো ফ্যাসিবাদের অন্ধকার গহ্বরে ফিরে যাবে না এবং দেশকে কোনোভাবেই তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হতে দেবে না। মাফিয়া চক্রের কোনো সদস্যের স্থান বাংলাদেশের আগামী রাজনীতিতে হবে না উল্লেখ করে এতে বলা হয়, বাংলাদেশ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অসংগত হস্তক্ষেপ না করা এবং সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে ভারতের সাথে ভবিষ্যতমুখী ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। তবে ২০১৩ সালের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি বা এক্সট্রাডিশন চুক্তির অধীনে বারবার অনুরোধ পাঠানো সত্ত্বেও শেখ হাসিনাকে ফেরত না পাঠিয়ে উল্টো তাকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যের মঞ্চ করে দেওয়া দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় ও সম্প্রীতিপূর্ণ সম্পর্ককে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে বাংলাদেশ হুঁশিয়ারি দেয়।
ঢাকার এই সরাসরি ও কঠোর বক্তব্য প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথেই দিল্লির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক নীতিনির্ধারক মহলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে একাধিক উচ্চপর্যায়ের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ঘটনাটি নিয়ে অভ্যন্তরীণ আত্মসমালোচনার খবরও পাওয়া গেছে। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের দপ্তর বাংলাদেশ সম্পর্কিত নীতি ও কৌশলগুলো সমন্বয় করে আসছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আগের দিন অজিত দোভালকেও সরাসরি আপত্তির কথা জানিয়ে আশ্বস্ত করা হলেও কথা না রাখায় ঢাকার অসন্তোষ চরম রূপ নেয়।
পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে এবং নড়েচড়ে বসে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, উদ্ভুত সংকট কাটিয়ে উঠে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বরফ গলাতে খুব শীঘ্রই দিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা একটি বিশেষ চিঠি নিয়ে ঢাকায় পৌঁছাচ্ছেন। ওই বিশেষ পত্রে সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস ও জোরদার করার ইতিবাচক বার্তার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের বিষয়েও আলোচনার ইঙ্গিত থাকতে পারে। তবে অন্তর্বর্তী ও বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন না বলেই প্রায় নিশ্চিত হওয়া গেছে।
একই সাথে ঢাকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠান বয়কট, নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক মহলের উসকানিমূলক বক্তব্যের ভাষা এবং ঢাকায় বিদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তাজনিত কারণে স্থান ত্যাগের ঘটনাগুলোর সাথে দিল্লির এই অঘটনটির কোনো রাজনৈতিক ছক বা অদৃশ্য যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। এদিকে আগামী ১০ই আগস্ট ঢাকায় অবস্থানরত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাথে এক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হবেন। নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই হবে প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার প্রথম দ্বিপক্ষীয় আলোচনা। বর্তমানের এই অস্থিতিশীল ও জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে মন্ত্রী পদমর্যাদার এই রাজনৈতিক diplomats-এর সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সিদ্ধান্তমূলক হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।