• শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৯ অপরাহ্ন
Headline
নবীজির স্মৃতিধন্য জলপাই বাগান দখলে ইসরাইলিরা যত্ন অর্থনীতি বা ‘কেয়ার ইকোনমি’: বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ৩ এনসিটিবির উপসচিব-সদস্যসহ আরও ৪ কর্মকর্তাকে বদলি তাহসিফের মৃত্যুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি রয়েছে: জামায়াত সশস্ত্র বাহিনী বোর্ডের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন ফি ১৬৮ টাকা রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে দ্বিতীয় ইউনিটের জ্বালানি সরবরাহ শুরু খাদ্যশস্য সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াতে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে: খাদ্যমন্ত্রী মানবতাবিরোধী অপরাধে হানিফের মৃত্যুদণ্ড, অপর তিন আসামির আমৃত্যু কারাদণ্ড চার বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ কৃষক কার্ড দেবে সরকার

তিতাসের সিস্টেম লসের নামে গ্যাস চুরি: বছরে গচ্চা সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ এলএনজি

Reporter Name / ৭৪ Time View
Update : বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের তীব্র জ্বালানি সংকটের মধ্যে যখন চড়া মূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করে জাতীয় অর্থনীতি চরম চাপের মুখে পড়ছে, ঠিক তখন গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থার ভয়াবহ অপচয় ও অনিয়মের এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। দেশের সর্ববৃহৎ গ্যাস বিতরণকারী সংস্থা তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির বিতরণ নেটওয়ার্কে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ গ্যাস হিসাবের বাইরে চলে যাচ্ছে। গত পাঁচ অর্থবছরে সংস্থাটির সামগ্রিক সিস্টেম লসের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০৯ কোটি ঘনমিটার, যা আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানি করা প্রায় ৪৫ থেকে ৪৮ কার্গো এলএনজির সমতুল্য। অর্থাৎ বছরে গড়ে অন্তত ১০ কার্গো এলএনজি কোনো অর্থনৈতিক সুফল ছাড়াই তিতাসের বিতরণ লাইনে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় এলএনজির দাম যখন আকাশচুম্বী এবং প্রতি কার্গো ক্রয়ে সরকারের ১ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, তখন বছরে কেবল এই অপচয় ও হিসাব-বহির্ভূত ব্যবহারের আর্থিক মূল্য দাঁড়াচ্ছে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী বিতরণ পর্যায়ে সর্বোচ্চ ২ শতাংশ পর্যন্ত সিস্টেম লস বা প্রযুক্তিগত ক্ষতি গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত। অথচ তিতাসের ক্ষেত্রে এই ক্ষতি অনুমোদিত সীমার প্রায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত পৌঁছেছে। সংস্থাটির নিজস্ব নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে সিস্টেম লস ২ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও পরবর্তী বছরগুলোতে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যা ছিল ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশে। শুধু গত অর্থবছরেই তিতাসের পাইপলাইন থেকে ১৪৪ কোটি ঘনমিটার গ্যাস হারিয়ে গেছে, যার প্রত্যক্ষ আর্থিক মূল্য ৩ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা। গত পাঁচ বছরে তিতাসের মোট সিস্টেম লস হওয়া গ্যাসের সার্বিক মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ হাজার ১৫৬ কোটি টাকায়, যা রাষ্ট্রায়ত্ত এই সংস্থার আর্থিক ভিত্তিকে ভেতর থেকে ধসিয়ে দিচ্ছে।
যে সময়ে দেশে গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চলতে পারছে না এবং শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, সে সময়ে জাতীয় সরবরাহের একটি বড় অংশ এভাবে হারিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই নিছক কারিগরি ত্রুটি হতে পারে না। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, যেখানে স্থানীয় উত্তোলন ও এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ মিলছে গড়ে মাত্র ২৩৩ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, তিতাসের বার্ষিক সিস্টেম লসের হার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে অন্তত ১৪ কোটি ঘনফুট বা বর্তমান দৈনিক সরবরাহের প্রায় ৬ শতাংশ গ্যাস অতিরিক্ত সরবরাহ করা যেত। এতে করে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমিয়ে এলএনজি আমদানি সাশ্রয় হতো, অন্যদিকে দেশীয় শিল্প খাতকেও গতিশীল রাখা সম্ভব হতো।
তিতাসের কর্মকর্তারা এই বিশাল অপচয়ের পেছনে অর্ধশতক পুরোনো জরাজীর্ণ পাইপলাইনের লিকেজ ও অবক্ষয়কে দায়ী করতে চাইছেন। তাঁদের দাবি, সাড়ে ১৩ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ নেটওয়ার্কের বড় একটি অংশ মাটির গভীরে চলে যাওয়ায় এবং পাইপ পুরনো হওয়ায় প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশের মতো গ্যাস লিকেজে নষ্ট হচ্ছে। তবে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞ ও খোদ তিতাসের একাংশও স্বীকার করছেন যে, বাকি পুরো ক্ষতিটিই মূলত সংঘবদ্ধ গ্যাস চুরি। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার ও মুন্সিগঞ্জের মতো শিল্পঘন এলাকাগুলোতে অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের বিস্তার সবচেয়ে বেশি। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে লাখ লাখ অবৈধ আবাসিক সংযোগ কিংবা শতাধিক বাণিজ্যিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে অভিযান শেষ হওয়ামাত্রই সেসব এলাকায় পুনরায় সংযোগ স্থাপন করা হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে তিতাসের এই ব্যর্থতা আরও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। বাংলাদেশে গ্যাসের সিস্টেম লস ভারতের তিন গুণ এবং পাকিস্তানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। আধুনিক টাউন বর্ডার স্টেশন (টিবিএস) প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সুনির্দিষ্ট নজরদারির মাধ্যমে পাকিস্তান তাদের সিস্টেম লস ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ১৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। ভারতেও বিতরণ পর্যায়ে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে ক্ষতি ৩ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং সেখানে চুরির ঘটনা নেই বললেই চলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল প্রযুক্তির অভাব নয়, বরং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার চূড়ান্ত ঘাটতিই তিতাসের গ্যাস চুরিকে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
জ্বালানি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ম তামিম স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, শুধু মাঝেমধ্যে লোকদেখানো অভিযান চালিয়ে এই জটিল সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলবে না। এলপিজির তুলনায় পাইপলাইনের গ্যাস অনেক বেশি সস্তা হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে অবৈধ সংযোগ নেওয়ার এক ধরনের অর্থনৈতিক প্রণোদনা তৈরি হয়। এই চুরির প্রবণতা রোধ করতে হলে বাসাবাড়িতে বাধ্যতামূলক প্রিপেইড মিটার স্থাপন, বিতরণ নেটওয়ার্কে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল মনিটরিং এবং ধীরে ধীরে গ্যাসের মূল্যকে বাজারভিত্তিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা অপরিহার্য। একই সঙ্গে তিতাসকে একক ঢাকাভিত্তিক কেন্দ্রীভূত কাঠামো থেকে বের করে এনে একাধিক অঞ্চলে প্রশাসনিকভাবে বিকেন্দ্রীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পাইপলাইন আধুনিকায়নের রোডম্যাপ অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে। রাষ্ট্রের কোটি কোটি ডলারের মূল্যবান জ্বালানি নিরাপত্তা যদি তিতাসের ছিদ্রযুক্ত পাইপলাইন ও চুরির সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে থাকে, তবে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই টেকসই রূপ পাবে না|

 

তথ্যসূত্র: বণিকবার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category