যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, ইরানে চলমান মার্কিন সামরিক অভিযানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মাসের পর মাস সময় লাগবে না, বরং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা সম্পন্ন হবে। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, যুদ্ধের ময়দানে তীব্র আক্রমণ চললেও পর্দার আড়ালে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ এখনো খোলা রেখেছে ওয়াশিংটন। আল-জাজিরাকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে রুবিও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নতুন সর্বোচ্চ নেতার রহস্যময় অন্তর্ধান এবং স্পেনের মতো ন্যাটো মিত্রদের অসহযোগিতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন।
পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও দ্বিমুখী নীতি
রুবিও নিশ্চিত করেছেন যে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি কোনো যোগাযোগ না থাকলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, “ইরানের ভেতরের কিছু পক্ষ এবং আমাদের মধ্যে যোগাযোগ চলছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব সময়ই আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পক্ষে।”
তবে আল-জাজিরার প্রতিনিধি কিম্বার্লি হালকেট জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র মূলত একটি ‘দ্বিমুখী নীতি’ বা ‘ডুয়াল ট্র্যাক’ পলিসি নিয়ে এগোচ্ছে। একদিকে তারা আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি দিচ্ছেন যে, দ্রুত যুদ্ধবিরতি না হলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো পুরোপুরি ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেওয়া হবে।
লক্ষ্য অর্জনে লাগবে মাত্র কয়েক সপ্তাহ
মার্কিন সামরিক অভিযানের অগ্রগতি নিয়ে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী মার্কো রুবিও। তিনি বলেন, “আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল ইরানের বিমানবাহিনী ধ্বংস করা, যা সম্পন্ন হয়েছে। নৌবাহিনী গুঁড়িয়ে দেওয়ার দ্বিতীয় লক্ষ্যও অর্জিত। এখন আমাদের মূল মনোযোগ তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং ড্রোন তৈরির কারখানাগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করা।” তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করেন, এই চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে মাসের পর মাস নয়, আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে।
পারমাণবিক কর্মসূচি ও আত্মরক্ষার বিতর্ক
সাক্ষাৎকারে রুবিও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ইরানকে অবশ্যই তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে। তাঁর দাবি, ইরানের এই অস্ত্রগুলো মূলত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য সরাসরি হুমকি।
তবে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “গত তিন শতাব্দীতে ইরান কবে তার প্রতিবেশীদের আক্রমণ করেছে?” আহমাদিয়ানের মতে, ইরানের সামরিক প্রস্তুতি মূলত একটি অসম যুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করার কৌশল মাত্র।
মোজতবা খামেনির অন্তর্ধান ও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বর্তমান অবস্থান নিয়ে রুবিও বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “বলা হচ্ছে তিনি ক্ষমতায়, কিন্তু কেউ তাঁকে দেখেনি বা তাঁর কোনো বক্তব্য শোনেনি। ইরানের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এখন অত্যন্ত ঘোলাটে।”
ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন বা ‘রেজিম চেঞ্জ’ বর্তমান অভিযানের মূল লক্ষ্য কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে রুবিও জানান, আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য এটি না হলেও, ইরানে যদি এমন কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে যা দেশটির জন্য মঙ্গলজনক, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাকে স্বাগত জানাবে এবং প্রয়োজনে সহায়তা করতেও প্রস্তুত থাকবে।
ন্যাটো মিত্রদের ওপর ক্ষোভ
ইরান যুদ্ধে স্পেনের মতো কিছু ন্যাটো মিত্রের অসহযোগিতায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, যুদ্ধের সময় এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশপথ এবং সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয়নি, উল্টো এ নিয়ে তারা গর্ববোধ করছে। রুবিও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যাদের রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি আমরা দিয়েছি, তারাই যদি আমাদের নিজস্ব ঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেয়, তবে যুদ্ধ শেষে এই সামরিক জোটের কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা আমাদের নতুন করে খতিয়ে দেখতে হবে।”