২০২৪-এর অগাস্ট পরবর্তী দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি কাটিয়ে অবশেষে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু করতে চলেছে ভারত ও বাংলাদেশ। বাংলাদেশে নবনির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর এই প্রথম কোনো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করছেন। ৭ই এপ্রিল বিকেলে দিল্লি পৌঁছানোর পর থেকে দুই দেশের মধ্যে যে পর্যায়ের আলোচনা চলছে, তা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে—উভয় পক্ষই এখন পুরনো তিক্ততা সরিয়ে বাস্তবমুখী সম্পর্কের দিকে এগোতে চায়।
সফরের প্রথম দিনেই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে একান্ত বৈঠক ও নৈশভোজে অংশ নেন ড. খলিলুর রহমান। এর পরদিন ৮ই এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন, বাণিজ্যিক সুবিধা পুনর্বহাল এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর জন্য জ্বালানি পাইপলাইন সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
বৈঠক শেষে এস জয়শঙ্কর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ লিখেছেন, “নানা দিকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করে তুলতে আমরা ফলপ্রসূ আলোচনা করেছি।” এমনকি দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দীর্ঘ পাল্লার ফ্লাইটে একসঙ্গে যাত্রার বিরল ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, দুই সরকারই একে অপরকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
একদিকে যখন সরকারি বৈঠক চলছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির দিল্লির বিজেপি সদর দপ্তর পরিদর্শন করেছেন। অগাস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় বাংলাদেশে যে তীব্র ‘ভারত-বিরোধী’ মনোভাব ও ভারতীয় পণ্য বয়কটের ডাক উঠেছিল, সেই প্রেক্ষাপটে বিজেপির বৈদেশিক শাখার প্রধানের সঙ্গে এই বৈঠকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি মূলত দুই দেশের শাসক দলের মধ্যে রাজনৈতিক ভুল বোঝাবুঝি দূর করার একটি প্রয়াস।
বাংলাদেশে বিদ্যমান ‘ভারত-বিদ্বেষী’ বয়ান মোকাবিলায় নরেন্দ্র মোদীর সরকার এক নজিরবিহীন পদক্ষেপের কথা ভাবছে। বিবিসি বাংলার তথ্যমতে, ঢাকায় ভারতের পরবর্তী হাই কমিশনার হিসেবে একজন সম্মানিত মুসলিম বুদ্ধিজীবী বা অবসরপ্রাপ্ত রাজনীতিবিদের নাম সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর (PMO)। লন্ডন বা ওয়াশিংটনের বাইরে অন্য কোনো রাজধানীতে রাজনৈতিক নিয়োগ ভারতের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। এর মাধ্যমে দিল্লি মূলত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছাতে চায়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, দিল্লি বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব চায়, কিন্তু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখানে একটি বড় ফ্যাক্টর। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন না মিটলে ভারতের নীতিতে বড় কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসা কঠিন। কারণ, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গকে ‘বাংলাদেশ হতে না দেওয়া’-র যে রাজনৈতিক হাতিয়ার ব্যবহার করছে, তাতে হুট করে বাংলাদেশ-বান্ধব অবস্থান নেওয়া তাদের জন্য কৌশলগতভাবে কঠিন হতে পারে।
সম্পর্কের সবচেয়ে বড় অস্বস্তির জায়গা এখন শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের আদালত কর্তৃক দণ্ডিত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে ফেরত দেওয়ার দাবি ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে জানালেও ভারত যে এখনই তাতে সাড়া দিচ্ছে না, তা পরিষ্কার। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত সোমেন রায়ের মতে, “কূটনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই। আওয়ামী লীগের সুফল ভারত পেয়েছে, এখন বিএনপির সঙ্গেও দিল্লি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে চায়। তবে হাসিনা ইস্যুটি যেন সম্পর্কের পথে বাধা না হয়, উভয় পক্ষই এখন তা চাইছে।”
সাবেক রাষ্ট্রদূত পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তীর মতে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ সবসময়ই ভারত-বিরোধী অবস্থানে ছিল, কিন্তু তাতে সম্পর্ক থেমে থাকেনি। বর্তমান বাস্তবতায় দুই দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য একে অপরের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, কোনো পক্ষই দীর্ঘকাল বিবাদে জড়িয়ে থাকতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ আর ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতিই হয়তো এই বরফ গলাতে সাহায্য করবে।