বাংলাদেশে উন্মোচিত প্রাকৃতিক গ্যাসের গচ্ছিত সঞ্চয় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, যা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তাকে এক অভূতপূর্ব ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, দেশের ২২টি গ্যাসক্ষেত্রে বর্তমানে মাত্র ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস অবশিষ্ট রয়েছে। নতুন করে বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে বর্তমান ব্যবহারের হার বজায় থাকলে আগামী ১২ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে এই সঞ্চিত সম্পদ শতভাগ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় কূপগুলো থেকে দৈনিক উত্তোলন আশঙ্কাজনক হারে কমতে থাকায় দেশের জ্বালানি খাত ক্রমেই আমদানীকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। প্রতি বছর সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের বৈদেশীক মুদ্রা খরচ করে এলএনজি কেনা হলেও জাতীয় চাহিদা ও জোগানের মধ্যবর্তী বিশাল ব্যবধান কোনোভাবেই মিটানো সম্ভব হচ্ছে না।
গত দেড় থেকে দুই দশকে দীর্ঘমেয়াদী ও সুদূরপ্রসারী কোনো মহাপরিকল্পনা না থাকা এবং স্থলভাগ ও বঙ্গোপসাগরে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান চালানোয় অবহেলার কারণেই মূলত আজকের এই অচল অবস্থা তৈরি হয়েছে। বিপুল পরিমাণ টাকা ডিমান্ড নোটের মাধ্যমে জমা দিয়েও মাসের পর মাস ধরে শত শত নতুন শিল্পকারখানা গ্যাসের সংযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় থমকে আছে। বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর মতে, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা না থাকায় নতুন বিনিয়োগ যেমন আটকে আছে, তেমনি প্রয়োজনীয় চাপের অভাবে সচল কারখানাগুলোর উৎপাদনও অর্ধেকে নেমে এসেছে। অনতিবিলম্বে সাগরে নতুন তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক টেন্ডার সফল করা এবং অতিরিক্ত এলএনজি রূপান্তর টার্মিনাল স্থাপন করা না গেলে কয়েক বছরের মধ্যে শিল্পখাতে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে আবিষ্কৃত মোট সঞ্চয়ের অর্ধেকেরও বেশি ইতিপূর্বে ব্যবহার করা হয়ে গেছে এবং বর্তমানে চালু থাকা প্রায় প্রতিটি বড় গ্যাসক্ষেত্রের দৈনিক জোগান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। দেশের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র তিতাস থেকে যেখানে একসময় দিনে ৫৪ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেত, সেখানে এখন সরবরাহ কমে তিন ভাগের এক ভাগে এসে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে বাখরাবাদ, সিলেট এবং মার্কিন অপারেটর শেভরনের পরিচালনাধীন বিবিয়ানা ক্ষেত্র থেকেও আগের তুলনায় নাটকীয়ভাবে উত্তোলন হ্রাস পেয়েছে। রূপগঞ্জের মতো ক্ষেত্রগুলোতে ইতিপূর্বে উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং সুন্দলপুরের মতো ছোট কূপগুলোও যেকোনো মুহূর্তে অকার্যকর হয়ে পড়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ভোলার মতো সম্ভাব্য ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও মূল ভূখণ্ডের সাথে পাইপলাইন সংযোগ না থাকায় সেই গ্যাস জাতীয় প্রয়োজনে কোনো কাজে আসছে না।
সঙ্কট সামাল দিতে সাবেক সরকারের আমলে হাতে নেওয়া ১০০টি কূপ খননের কর্মসূচিকে সম্প্রসারিত করে ১৫০টিতে উন্নীত করার উদ্যোগ থাকলেও তার বাস্তব ফলাফল অত্যন্ত হতাশাজনক। ইতোমধ্যে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা খরচ করে ৩০টি কূপে ড্রিলিং সম্পন্ন করা হলেও তা থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক মাত্র ১২ কোটি ঘনফুট গ্যাস যোগ করা সম্ভব হয়েছে, যা প্রতিবছর প্রাকৃতিকভাবে কমে যাওয়া উৎপাদনের পরিমাণের চেয়েও কম। ধারণা করা হচ্ছে, কার্যকর নতুন উৎস খুঁজে না পেলে আগামী কয়েক বছরে দেশীয় ক্ষেত্রগুলোর সার্বিক উৎপাদন দৈনিক আরও বহুগুণ কমে যাবে। এতে করে চাহিদা ও সরবরাহের বিশাল ব্যবধানে শত শত বাণিজ্যিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো বিপর্যয় তৈরি হবে।
পরিস্থিতির আশু সামাল দিতে পেট্রোবাংলা বিদ্যমান কূপগুলোর আশপাশে দ্রুত নতুন কূপে খননকার্য চালাচ্ছে এবং চীনের সহায়তায় মাতারবাড়ীতে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে মার্কিন জ্বালানি জায়ান্ট শেভরন সিলেট অঞ্চলের নতুন দুটি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের আগ্রহ প্রকাশ করে দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তাবনা দিয়েছে, যা বাস্তবায়ন করা গেলে আগামীতে এলএনজি আমদানির বিশাল ব্যয় অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। তবে নীতি নির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িক বা তড়িঘড়ি পদক্ষেপে এই মহাপরিমাণ সংকট কাটানো সম্ভব নয়। দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, গভীর সাগরে দ্রুত ব্লক ভিত্তিক তল্লাশি জোরদার এবং আমদানীকৃত অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদী আধুনিকায়নই পারে দেশের শিল্পখাত ও অর্থনীতিকে সম্ভাব্য ভয়াবহ পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে।
তথ্যসূত্র: ৭১টিভি ও যুগান্তর