• শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩৩ অপরাহ্ন

১০ জেলায় টেঁটাবাহিনীর তাণ্ডব, রয়েছে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পও

Reporter Name / ৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

মানবসভ্যতা যখন মহাকাশ জয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চরম শিখরে অবস্থান করছে, ঠিক তখন বাংলাদেশের চরাঞ্চল ও নদীবেষ্টিত বেশ কয়েকটি জেলায় আদিম ও মধ্যযুগীয় প্রাণঘাতী অস্ত্র ‘টেঁটা’র নির্মম রাজত্ব চলছে। জমিজমার সামান্য বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, জলাশয় দখল কিংবা পারিবারিক কোন্দলকে কেন্দ্র করে মুহূর্তের মধ্যে শত শত মানুষ এই বিষাক্ত লোহার অস্ত্র নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর হামলে পড়ছে। রাজবাড়ীর পাংশায় সীমানা প্রাচীর নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের টেঁটাযুদ্ধই কেবল শেষ কথা নয়; বরং দেশের অন্তত ১০টি জেলায় এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখন প্রতিদিনের সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। গত তিন বছরে পাঁচ অর্ধেকেরও বেশি ছোট-বড় টেঁটাযুদ্ধে শতাধিক মানুষের করুণ মৃত্যু হয়েছে এবং পঙ্গুত্ববরণ করেছেন অগণিত সাধারণ নাগরিক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টেঁটা দেখতে সাধারণ মনে হলেও শারীরিক ক্ষতির বিচারে এটি অত্যন্ত বীভৎস একটি মারণাস্ত্র। একটি কাঠের লম্বা হাতলের মাথায় ছাতার আকৃতিতে পাঁচটি থেকে নয়টি বা তারও বেশি ধারালো লোহার ফলা আটকে এটি তৈরি করা হয়। ফলার অগ্রভাগে মাছের বড়শির মতো বাঁকানো খাঁজ থাকায় এটি মানবদেহের ভেতরে প্রবেশ করলে তা টেনে বের করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। পেশী ও নাড়িভুঁড়ি ছিঁড়ে আসার আশঙ্কায় জটিল অস্ত্রোপচার ছাড়া টেঁটা শরীর থেকে আলাদা করা যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসালয়ে পৌঁছানোর পূর্বেই প্রাণ হারান। কামারশালাগুলোতে গোপনে এই অস্ত্র তৈরি করা হচ্ছে, যা আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চরাঞ্চলের ঘরে ঘরে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে, এই সংঘাতগুলো কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও গোপন প্রশিক্ষণ। নরসিংদী, ফরিদপুর কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে যুবকদের ছোটবেলা থেকেই চলন্ত লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে টেঁটা নিক্ষেপ করার কৌশল শেখানো হয়। ঢাল ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের আঘাত ঠেকানো এবং দ্রুত দৌড়ে গিয়ে হাঁটু বা শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত হানার বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, চরাঞ্চলে এখন ভাড়াতে ‘টেঁটাবাহিনী’র আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী মোড়ল ও রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে নগদ অর্থের বিনিময়ে যুবকদের ভাড়ায় এনে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত করাচ্ছে।

প্রযুক্তি ও আগ্নেয়াস্ত্রের আধুনিক যুগেও অপরাধীরা কৌশলগত কারণেই টেঁটা ব্যবহারকে প্রাধান্য দিচ্ছে। আগ্নেয়াস্ত্র বা গুলি ব্যবহার করলে ব্যালাস্টিক পরীক্ষা ও গুলির খোসা বিশ্লেষণ করে সহজেই অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। কিন্তু টেঁটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো ফরেনসিক তথ্যপ্রমাণ অবশিষ্ট না থাকায় আসামিদের গ্রেপ্তার করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে চরম বেকায়দায় পড়তে হয়। অনেক সময় হাজার হাজার উগ্র জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে গিয়ে টিয়ার শেল বা ফাঁকা গুলি চালিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে না অল্প সংখ্যক পুলিশ। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালাতে গেলে স্থানীয় মাতব্বররা নারীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পেছন থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে টেঁটা ছোঁড়ে, যা নিরাপত্তা কর্মীদের অসহায় করে তোলে।

নরসিংদীর রায়পুরা ও আলোকবালি, রাজবাড়ীর পাংশা এবং ফরিদপুরের সালথা ও ভাঙ্গার মতো এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও সামাজিক বিভাজনের কারণেই এই সহিংসতা থামছে না। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের অভাব এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার কারণে একটি সংঘর্ষের পর তৈরি হওয়া প্রতিশোধের মানসিকতা পরবর্তী বড় সংঘাতের জন্ম দেয়। উপরন্তু, তুর্কি বা রাজনৈতিক অপপ্রচারের ওপর ভিত্তি করে রটানো গুজব এবং তুচ্ছ বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে চরাঞ্চলের নারী ও শিশুদেরও অনায়াসে সংঘর্ষের মাঠে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন যে, কেবল লাঠিচার্জ কিংবা মামলার ভয় দেখিয়ে যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এই সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সচেতন সংগঠন এবং ধর্মীয় নেতাদের সমন্বয়ে দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির মধ্যস্থতা গড়ে তোলা না গেলে এই টেঁটাযুদ্ধের বীভৎসতা থামানো সম্ভব হবে না। পুলিশের সমন্বিত তদারকির পাশাপাশি চরাঞ্চলের জনগণকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা, স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গোপন কামারশালাগুলোতে কঠোর তদারকি জোরদার করার মধ্য দিয়েই কেবল এই আদিম মারণাস্ত্রের ছায়া থেকে দেশকে মুক্ত করা যেতে পারে।

তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category