• মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ১২:২০ অপরাহ্ন

দেশীয় শিল্পে মেগা করছাড়, কমবে ও বাড়বে যেসব পণ্যের দাম

Reporter Name / ৭ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ বা দেশীয় শিল্পকে পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা দিতে এবার শুধু আয়কর অব্যাহতিই নয়, বরং ভ্যাট (মূূল্য সংযোজন কর) এবং কাঁচামাল আমদানির শুল্ক-করেও নজিরবিহীন ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। মূলত দেশীয় কারখানার সম্প্রসারণ, নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, লাখ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তৈরি পোশাক খাতের বাইরে বিকল্প রপ্তানি বাণিজ্যকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করতেই এই বিশাল করছাড়ের রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে।

বাজেটের এই মহাপরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে দেশের সম্ভাবনাময় ইলেকট্রনিক্স এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত। এই খাতের করছাড়ের মেয়াদ ২০৩০ থেকে বাড়িয়ে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্ত আসতে যাচ্ছে। এর সরাসরি সুফল পাবেন দেশের সাধারণ ভোক্তারা। পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কর্মরত তরুণদের জন্য থাকছে মেগা সুখবর; কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ওপর বিদ্যমান সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট এবং ৭ শতাংশ আয়কর পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেওয়া হতে পারে। তবে দেশীয় ফল, মাছ ও তামাক খাতকে সুরক্ষা দিতে বেশ কিছু বিদেশি ও বিলাসী আমদানিপণ্যের ওপর শুল্কের বোঝা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

করের সুখবরে যেসব পণ্যের দাম কমতে পারে

আসন্ন বাজেটে শুল্ক ও ভ্যাট হ্রাসের কারণে মূলত ৯টি খাতের পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসবে:

১. ইলেকট্রনিক্স ও গৃহস্থালি সামগ্রী

স্থানীয় কারখানায় উৎপাদিত টেলিভিশন, এসি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিনসহ সব ধরনের গৃহস্থালি (হাউসহোল্ড) পণ্যের ভ্যাট এক লাফে ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হচ্ছে। বিগত দুই অর্থবছরে শুল্ক বাড়ানোর ফলে বিদেশি পণ্যের আমদানি ২০ শতাংশ বেড়েছিল, যা দেশীয় শিল্পের বাজার সংকুচিত করে। বর্তমানে দেশের ২২টি ইলেকট্রনিক্স কারখানায় অন্তত ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। এই খাতকে সুরক্ষায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত কাঁচামাল আমদানিতেও বড় ছাড় দেওয়া হবে, যার ফলে দেশে তৈরি ফ্রিজ-এসির দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।

২. জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী

জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ওষুধ তৈরির ৬৮ ধরনের আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর থেকে সম্পূরক শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এছাড়া হৃদরোগীদের জন্য হার্টের রিং এবং চোখের লেন্সের ওপর থাকা ১০ শতাংশ ভ্যাট তুলে নেওয়া হচ্ছে। একই সাথে ক্যান্সারের ৯ ধরনের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ আমদানিতে বড় কর রেয়াত সুবিধা পাওয়ায় চিকিৎসা খরচ সাধারণ মানুষের সাধ্যে চলে আসবে।

৩. নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্য

নিত্যপণ্যের বাজার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় রাখতে চাল, ধান, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, ভোজ্যতেল ও বীজসহ মোট ৬০টি নিত্যপণ্যের উৎসে কর ৫, ২ ও ১ শতাংশের ঘর থেকে নামিয়ে একবারে শূন্য দশমিক ৫ (০.৫%) শতাংশ করা হচ্ছে। এছাড়া শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে আমদানি করা শিশুখাদ্যের শুল্কও কমানো হচ্ছে।

৪. পরিবেশবান্ধব সবুজ শক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি

জ্বালানি তেলের ওপর চাপ কমাতে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে করছাড় ২০৩০ সাল পর্যন্ত এবং সৌর বিদ্যুতের সব উপকরণ আমদানিতে শুল্ক অব্যাহতি ২০৩১ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এছাড়া সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকে ২০Check৩৫ সাল পর্যন্ত সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখা এবং সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের মূল বিদ্যুৎ বিলে ৫ শতাংশ রেয়াত বা ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

৫. ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড গাড়ি

পরিবেশবান্ধব ও জ্বালানি সাশ্রয়ী ইলেকট্রিক গাড়ি (ইভি) ও ই-বাইক উৎপাদনে বিশেষ কর রেয়াত দেওয়া হচ্ছে। ইভি গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে ফিক্সড ২ লাখ টাকা অগ্রিম আয়করের পরিবর্তে গাড়ির কিলোওয়াট ক্ষমতা অনুযায়ী ২৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া ১৮০০ সিসি পর্যন্ত নতুন হাইব্রিড গাড়ি আমদানির নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (আরডি) সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করায় পরিবেশবান্ধব গাড়ির দাম কমবে।

৬. কম্পিউটার ও মোবাইল সামগ্রী

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশে দেশে উৎপাদিত ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মনিটর ও মোবাইল সেটের ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় মোবাইল কারখানার ২২টি অতি প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির অগ্রিম কর ৫ ও ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশে নামানো হচ্ছে। পাশাপাশি কম্পিউটার ও প্রিন্টারের যন্ত্রাংশ আমদানির অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হবে।

৭. স্বর্ণালঙ্কার ও জুয়েলারি খাত

স্বর্ণালঙ্কার বিক্রিতে বর্তমানে প্রচলিত ৫ শতাংশ ভ্যাটের জটিল হিসাব বাতিল করে প্রতি ভরিতে নির্দিষ্ট (স্পেসিফিক) ২ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারণ করা হতে পারে। এতে ভরিতে ভ্যাটের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার টাকা কমবে। এই সুবিধা দেওয়ার শর্তে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) এই খাত থেকে বছরে ৪০০ কোটি টাকা ভ্যাট রাজস্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া এই খাতের উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করা হচ্ছে।

৮. কিডনি ডায়ালাইসিস ও অন্যান্য সেবা

  • কিডনি ডায়ালাইসিস: কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানির ৫ শতাংশ আগাম কর তুলে নেওয়ায় প্রতিবার ডায়ালাইসিসের খরচ প্রায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত কমে আসবে।

  • শারীরিক প্রতিবন্ধী: প্রতিবন্ধীদের ব্যবহৃত ১৫টি আমদানি পণ্যের অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১-২ শতাংশ করা হচ্ছে।

  • মোবাইল সিম: সাধারণ গ্রাহকদের সুবিধার জন্য মোবাইল সিমের ওপর থাকা ৩০০ টাকা ট্যাক্স সম্পূর্ণ বাতিল হচ্ছে।

  • এটিএম ও বাদ্যযন্ত্র: এটিএম কার্ড তৈরির কাঁচামাল ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র আমদানির ৫ শতাংশ আগাম কর এবং ১১৩টি পণ্যের ৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হচ্ছে।

দেশীয় খামারিদের স্বার্থে যেসব বিদেশি পণ্যের দাম বাড়বে

আমদানি নির্ভরতা কমাতে এবং তামাকের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে বেশ কিছু পণ্যের ওপর শুল্কের হার সর্বোচ্চ স্তরে নেওয়া হচ্ছে, যার ফলে এগুলোর দাম বাড়বে:

  • কাজু বাদাম ও হিমায়িত মাছ: দেশে বাণিজ্যিকভাবে কাজু বাদাম চাষ শুরু হওয়ায় দেশীয় ফলের সুরক্ষায় বিদেশি কাজু বাদাম আমদানির শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে এক লাফে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এছাড়া পাঙাস মাছের ফিলেট আমদানিতে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং উচ্চ মূল্যের বিদেশি হিমায়িত মাছ আমদানিতে ১৫ শতাংশ নতুন ভ্যাট বসানো হচ্ছে।

  • তামাক ও সিগারেট: ধূমপান কমাতে সিগারেটের দাম প্যাকেট প্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া খুচরা তামাক বিক্রেতাদের হাজারে ২ টাকা অগ্রিম কর দিতে হবে। সিগারেটের ফিল্টার পেপার আমদানিতে ৩০০ শতাংশ, নিকোটিনে ৩৫০ শতাংশ এবং নিকোটিন পাউচে ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসানো হচ্ছে।

  • দেশি ও বিদেশি মদ: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানির তৈরি দেশি মদে প্রতি লিটারে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা সুনির্দিষ্ট ভ্যাট বসানো হচ্ছে। এছাড়া বিদেশি মদের ওপর ব্র্যান্ডভেদে সর্বোচ্চ ৪৫০ থেকে ৬০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বহাল বা বৃদ্ধি করায় সব ধরণের মদের দাম বাড়বে।

  • কনস্ট্রাকশন সামগ্রী (এমএস রড): দেশে উৎপাদিত মাইল্ড স্টিল (এমএস রড) এবং এ জাতীয় আবাসন পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কর ও ভ্যাট প্রায় ১০ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে, যার ফলে ঘর তৈরির রডের দাম বাজারে কিছুটা বাড়তে পারে।

  • বিলাসী সামগ্রী: বিদেশি প্রসাধনী, ব্র্যান্ডের ফেস ক্রিম, লিপস্টিক, বিলাসী গাড়ি এবং নতুন ১০টি উচ্চমূল্যের আমদানিকৃত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ওপর ২০ শতাংশ আমদানি ভ্যাট বসানোর কারণে এগুলো আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।

তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category