বাংলাদেশে সংঘবদ্ধ অপরাধের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সূচক ‘গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্স-২০২৫’ অনুযায়ী, ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছয় ধাপ এগিয়ে এখন ৮৩তম স্থানে। এই সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ৫.৩০, যা গত ২০২৩ সালের সূচকের (৫.১২) তুলনায় বেশি। এই স্কোর বৃদ্ধি মূলত দেশে আর্থিক অপরাধ, মানব পাচার এবং অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান বৃদ্ধির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বেসরকারি খাতে আর্থিক অপরাধের মাত্রা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেক অসাধু ব্যক্তি হুন্ডি ও বিভিন্ন অবৈধ পন্থায় বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করছেন। মেহেরপুরের মুজিবনগর সীমান্তে ঘাসভর্তি বস্তায় ডলার পাচারের মতো ঘটনাগুলো দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাবের একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। অর্থনীতিবিদদের মতে, এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে মানব পাচারের ক্ষেত্রে। নারী ও কন্যাশিশুদের যৌন শোষণ এবং জোরপূর্বক শ্রম আদায়ের উদ্দেশ্যে পাচারের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া বিয়ের প্রলোভন বা বিদেশের লোভনীয় চাকরির নাম করে পাচার করা হচ্ছে। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এই পাচারকারী চক্রের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।
আর্থিক ও মানব পাচারের পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় অস্ত্র চোরাচালান এবং মাদক ব্যবসা আগের তুলনায় বেড়েছে। অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্স বলছে, অস্ত্র চোরাচালান দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া নকল পণ্যের বাজারজাতকরণও এখন বড় একটি সংগঠিত অপরাধে রূপ নিয়েছে।
সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কার কাজে অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে গিয়ে আইন-শৃঙ্খলার কিছু ক্ষেত্রে শিথিলতা তৈরি হয়েছিল, যার সুযোগ নিয়েছে অপরাধী চক্র। তবে বর্তমানে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “অপরাধ দমনে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা যাবে না। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়িয়ে এসব সংঘবদ্ধ চক্রকে দ্রুত শনাক্ত করা এবং নিরপেক্ষভাবে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।”
এশিয়ার ৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ২৪তম। তালিকায় ৮.০৮ স্কোর নিয়ে শীর্ষে রয়েছে মিয়ানমার। এরপর কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও একুয়েডরের মতো দেশগুলোর অবস্থান। বাংলাদেশে অপরাধের মাত্রা এখনো ‘মধ্যম পর্যায়ে’ থাকলেও এর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ঠেকাতে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।