রাশিয়ার একটি আবাসন ও নির্মাণ সংস্থায় ভালো বেতনে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ জন বাংলাদেশী রেমিট্যান্স যোদ্ধাকে ইউক্রেন সীমান্তের চরম যুদ্ধকবলিত অঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার এক ভয়াবহ তথ্য সামনে এসেছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, একটি আন্তর্জাতিক দালাল সিন্ডিকেট অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এসব নিরীহ কর্মীকে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করে দিয়েছে। বর্তমানে তারা ইউক্রেনীয় বোমাবর্ষণ ও ড্রোন হামলার মুখে চরম যুদ্ধঝুঁকির মধ্যে অবরুদ্ধ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। নিখোঁজ স্বজনদের অক্ষত অবস্থায় ফিরে পাওয়ার দাবিতে এবং সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপের আশায় আতঙ্কিত পরিবারগুলো এখন ঢাকায় অবস্থিত রাশিয়ান দূতাবাসের সামনে মানববন্ধনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাশিয়ার ওড়েনবার্গ শহরে অবস্থিত ‘পিআরও টেকনোলজি লিমিটেড’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ৭০ জন কর্মীর চাহিদাপত্র পায় ঢাকার রিক্রুটিং এজেন্সি ‘মেসার্স আর এস ইন্টারন্যাশনাল’ (আরএল নম্বর-১৪২৮)। মস্কোর বাংলাদেশ দূতাবাস সরেজমিন যাচাই-বাছাই শেষে ৩৪ জন কর্মীর ভিসা সত্যায়ন করার পর প্রথম দফায় ৩০ জন কর্মীকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু মস্কো থেকে গন্তব্যে পৌঁছানোর পরপরই শুরু হয় প্রতারণা। নির্মাণ কাজের পরিবর্তে তাদের একটি যুদ্ধাস্ত্র বা ড্রোন সংযোজন (ড্রোন অ্যাসেম্বলিং) কারখানায় কাজ করতে বাধ্য করা হয়। কর্মীরা এতে আপত্তি জানালে, তাদের কনস্ট্রাকশন কাজের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে সোজা নিয়ে যাওয়া হয় ইউক্রেনীয় বাহিনীর সাথে তুমুল লড়াই চলতে থাকা বিতর্কিত ‘দোনেৎস্ক’ (Donetsk) শহরে। এলাকাটি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে হওয়ায় কর্মীরা এখন মৃত্যুভয়ে ছটফট করছেন।
ঘটনার আকস্মিকতায় গত ১৯ মে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মোখতার আহমেদের কাছে লিখিত আবেদন করেন আর এস ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মো: মোস্তাফিজুর রহমান। ‘রাশিয়ায় প্রেরিত কর্মীদের চাকরিজনিত সমস্যা সমাধানে জরুরি সহযোগিতা প্রসঙ্গে’ শিরোনামের ওই চিঠিতে কর্মীদের দ্রুত নিরাপদ কর্মপরিবেশে ফিরিয়ে আনার জন্য অনুরোধ জানানো হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। এদিকে, ঘটনার পর থেকেই মূল অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমানের মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রের সাথে ‘জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল’ ও ‘এস টি এস ওভারসিজ’-এর মতো আরও কয়েকটি এজেন্সির মালিক জড়িত, যারা রাশিয়া পাঠানোর নাম করে প্রতি শ্রমিকের কাছ থেকে সাত থেকে আট লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিয়েছে।
এদিকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কোনোমতে পাঠানো দু-একজন কর্মীর খুদেবার্তা (এসএমএস)-এর বিবরণ অত্যন্ত লোমহর্ষক। রাজবাড়ী জেলার একজন কর্মীর স্ত্রী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তাঁর স্বামী গোপনে একটি মেসেজ পাঠিয়েছেন, যেখানে লেখা ছিল—“তোমরা আমার আশা ছেড়ে দাও। আমার মনে হয় আর বেঁচে দেশে ফেরা সম্ভব নয়। যদি আমি আর না ফিরি, তবে সন্তানদের মাদরাসায় লেখাপড়া করাইও। আমি যে মেসেজ পাঠাইছি, এটা যদি রাশিয়ার সেনাবাহিনী জানতে পারে, তবে আমাকে মেরেই ফেলবে।” বাকি ২৯টি পরিবারের চিত্রও একই রকম। ঢাকার খিলক্ষেত থানায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলেও পুলিশ তা গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।
জনশক্তি খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও ‘ফ্লেয়ার রিক্রুটিং এজেন্সি’র মালিক আনিসুর রহমান এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বৈধভাবে গিয়ে কর্মীরা এভাবে জিম্মি হওয়া দেশের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। এমনিতেই মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজার নিয়ে জটিলতা চলছে, তার ওপর রাশিয়ার মতো একটি সম্ভাবনাময় ও নতুন শ্রমবাজার যদি এমন মানবপাচার ও দালাল চক্রের কারণে নষ্ট হয়ে যায়, তবে দেশের রেমিট্যান্স খাতে বড় বিপর্যয় নেমে আসবে। সচেতন মহল মনে করছেন, রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় যদি অতি দ্রুত কূটনৈতিক পর্যায়ে রুশ সরকারের সাথে যোগাযোগ না করে, তবে এই ৩০ জন বাংলাদেশীর জীবন প্রদীপ চিরতরে নিভে যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত