• বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ১০:৪০ অপরাহ্ন
Headline
চল্লিশের পর নারীর সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য রক্ষা: ৮টি পরামর্শ ফাহাদ রহমানের মুকুটে যুক্ত হলো দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম সায়নীর শিরশ্ছেদের জন্য ১ কোটি রুপি পুরস্কার ঘোষণা, বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ রামিসা হত্যা: দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জমার আশ্বাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ: কৃষিমন্ত্রী গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব সরকার যতদিন চাইবে, মাঠে থেকে কাজ করবে সেনাবাহিনী: সেনাপ্রধান সরকারি বিদ্যালয় সংকট: ঢাকায় স্বল্পব্যয়ে মাদরাসায় ঝুঁকছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ইবোলার টিকা আসতে ৯ মাস লাগতে পারে: ডব্লিউএইচও আড়াইহাজারে চাঁদা দাবির জেরে বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা: স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাসহ আটক ৩

পারমাণবিক ফাঁদে বাংলাদেশ: মিয়ানমারের গোপন পরমাণু কর্মসূচি ও ভূ-রাজনৈতিক শঙ্কা

Reporter Name / ৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় এবং নীরব আতঙ্কের নাম হতে যাচ্ছে মিয়ানমারের পারমাণবিক কর্মসূচি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমনিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তিন দিক থেকে পারমাণবিক অস্ত্রধারী শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত বাংলাদেশ। এবার যদি দক্ষিণ-পূর্বের একমাত্র প্রতিবেশী মিয়ানমারও পারমাণবিক শক্তি বা অস্ত্র অর্জন করে ফেলে, তবে বাংলাদেশ আক্ষরিক অর্থেই এক ভয়াবহ ‘পারমাণবিক মারণফাঁদে’ আটকা পড়বে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, মিয়ানমারের জান্তা সরকারের এই পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ নয়, বরং পুরো অঞ্চলের—বিশেষ করে বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত।

আজকের এই বিশেষ বিশ্লেষণে আমরা খতিয়ে দেখব মিয়ানমারের পারমাণবিক কর্মসূচির নেপথ্যের গল্প, আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর ইন্ধন এবং বাংলাদেশের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব।

শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের আড়ালে ভয়ংকর পরিকল্পনা?

মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠী, যাদের মূলত ‘বামা’ বা ‘বর্মান’ বলা হয়, তাদের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা নতুন কিছু নয়। তবে ২০২৩ সালে এসে দেশটিতে ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তা প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেন যে, তারা রাশিয়ার সহায়তায় পরমাণু প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা ‘রসাটম’ (Rosatom)-এর সাথে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় মিয়ানমারে ‘স্মল মডুলার রিঅ্যাক্টর’ (SMR) বা ছোট আকারের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যেকোনো নতুন দেশের মতোই মিয়ানমারও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দাবি করছে, তাদের এই প্রযুক্তি কেবলই শান্তিপূর্ণ কাজে—যেমন চিকিৎসা খাত বা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরমাণু বিশেষজ্ঞরা মিয়ানমারের এই ‘লোক দেখানো’ যুক্তি সহজে গিলতে নারাজ। এর পেছনে শক্ত কারণও রয়েছে। মিয়ানমারে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে জলবিদ্যুৎ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের বিশাল মজুত রয়েছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক সস্তা ও নিরাপদ বিকল্প। বর্তমানে দেশটির অর্থনীতি চরম ভঙ্গুর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; বিদেশি বিনিয়োগ তলানিতে এবং মুদ্রাস্ফীতি চরমে। এমন একটি দেউলিয়া প্রায় পরিস্থিতিতে শত শত কোটি ডলার খরচ করে কেন তারা এই ব্যয়বহুল, জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রযুক্তির পেছনে মরিয়া হয়ে ছুটছে? ঠিক এখানেই জন্ম নিয়েছে আসল সন্দেহের। বিশ্লেষকদের ধারণা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেবল একটি আবরণ মাত্র, আসল লক্ষ্য পারমাণবিক অস্ত্র বা অন্তত ‘নিউক্লিয়ার থ্রেশহোল্ড’ (পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্ত) অর্জন করা।

উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া ও চীনের ছায়া

মিয়ানমারের পারমাণবিক কর্মসূচির সাথে উত্তর কোরিয়ার (পিয়ংইয়ং) গোপন আঁতাতের ইতিহাস বেশ পুরোনো। ২০১০ সালের দিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং ‘ডেমোক্রেটিক ভয়েস অব বার্মা’ (DVB) মিয়ানমারের গোপন সুড়ঙ্গ এবং পারমাণবিক চুল্লি তৈরির কিছু নথি ফাঁস করেছিল, যেখানে উত্তর কোরিয়ার প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রমাণ মিলেছিল। পরবর্তীতে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকারের আমলে এবং মার্কিন চাপে উত্তর কোরিয়ার সাথে মিয়ানমারের এই সম্পর্ক কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর জান্তা সরকার যখন আবার আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ে, তখন তারা পুরোনো মিত্র পিয়ংইয়ংয়ের সাথে নতুন করে পিরিত জমিয়েছে।

বর্তমানে মিয়ানমারের সামরিক সরকার উত্তর কোরিয়া, বেলারুশ, ইরান ও রাশিয়ার সমন্বয়ে গঠিত একটি অঘোষিত অক্ষশক্তির সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, পরাশক্তি চীন বা রাশিয়া হয়তো সরাসরি মিয়ানমারকে পারমাণবিক অস্ত্র প্রযুক্তি দিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্কে বা জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার মুখে সরাসরি জড়াতে চায় না। তাই তারা নিজেদের ‘ছায়া প্রতিনিধি’ বা প্রক্সি হিসেবে উত্তর কোরিয়াকে লেলিয়ে দিয়েছে মিয়ানমারকে পেছনের দরজা দিয়ে (Back-step) সাপোর্ট দেওয়ার জন্য।

শুধু তা-ই নয়, গুগল আর্থের স্যাটেলাইট ইমেজে মিয়ানমারের গহীন অঞ্চলে বেশ কিছু সন্দেহজনক সামরিক ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনার অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। এর পাশাপাশি গোয়েন্দা মহলে গুঞ্জন রয়েছে যে, বেশ কয়েক বছর আগে দক্ষিণ এশিয়ার দুজন পরমাণু বিজ্ঞানী আন্তর্জাতিক তদন্তের মুখে পড়ে মিয়ানমারে পালিয়ে আসেন এবং রহস্যজনকভাবে গায়েব হয়ে যান। এসব খণ্ড খণ্ড ঘটনা এবং তথ্য জোড়া দিলে যে চিত্রটি দাঁড়ায়, তা অত্যন্ত ভীতিজাগানিয়া। বর্তমানে জান্তারা রাশিয়ার কাছ থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করছে বলেও খবর আসছে, যার কোনো সদুত্তর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) মিয়ানমারের কাছে পায়নি।

বাংলাদেশের জন্য কেন এটি চরম বিপদের কারণ?

মিয়ানমারের এই পারমাণবিক আস্ফালন বাংলাদেশের জন্য বহুমুখী এবং দীর্ঘস্থায়ী বিপদ ডেকে আনবে। আসুন কয়েকটি পয়েন্টে বিষয়টি সহজভাবে বুঝে নিই:

১. ভৌগোলিক মারণফাঁদ ও কৌশলগত ভারসাম্যহীনতা:

বাংলাদেশের তিন দিকে রয়েছে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ভারত। এখন যদি দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীও পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করে, তবে বাংলাদেশ চারদিক থেকেই পারমাণবিক হুমকির মধ্যে পড়ে যাবে। বাংলাদেশ একটি শান্তিকামী ও পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত দেশ। সামরিক দিক থেকে মিয়ানমার যদি এই ধরনের মারণাস্ত্র পেয়ে যায়, তবে এই অঞ্চলের সামরিক ও কৌশলগত ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে এবং বাংলাদেশ স্থায়ী একটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে।

২. রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে চিরস্থায়ী অচলাবস্থা:

ইতিমধ্যেই মিয়ানমার তাদের রাখাইন রাজ্য থেকে জাতিগত নিধনের মাধ্যমে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করে এক বিশাল মানবিক, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করেছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় এই রোহিঙ্গাদের সসম্মানে ফেরত পাঠানোর জন্য কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মিয়ানমারের হাতে যদি একবার পরমাণু অস্ত্র বা সক্ষমতা চলে আসে, তবে তারা বিশ্ব জনমতের তোয়াক্কা করা পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে। পারমাণবিক অস্ত্রের ‘রক্ষাকবচ’ পিঠে থাকলে তাদের বাংলাদেশ-বিদ্বেষী মনোভাব ও ঔদ্ধত্য আরও কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। তখন রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া তো দূরের কথা, তারা উল্টো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে হুমকি দেবে।

৩. সীমান্ত সংঘাত ও ব্ল্যাকমেইল:

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে প্রায়ই উত্তেজনা দেখা যায়। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মিসহ (AA) বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে জান্তা বাহিনীর চলমান গৃহযুদ্ধের গোলা প্রায়ই বাংলাদেশের সীমান্তে এসে পড়ে। মিয়ানমার যদি পারমাণবিক শক্তি অর্জন করে, তবে যেকোনো ছোটখাটো সীমান্ত সংঘাত বা কূটনৈতিক তর্কে তারা বাংলাদেশকে পারমাণবিক হামলার ভয় দেখিয়ে ‘ব্ল্যাকমেইল’ করতে চাইবে। এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করবে।

৪. আদিবাসী নিধন ও আঞ্চলিক চরম অস্থিরতা:

মিয়ানমারের বামা (Bamar) শাসকগোষ্ঠী বর্তমানে নিজেদের দেশের ভেতরে থাকা বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বা বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ওপর যেভাবে নির্বিচারে বিমান ও কামান হামলা চালাচ্ছে, তাতে দেশটিতে চরম মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে। পারমাণবিক শক্তি পেলে সামরিক জান্তা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। তারা জানবে যে, পারমাণবিক অস্ত্র থাকার কারণে পশ্চিমা বিশ্ব বা জাতিসংঘ তাদের ওপর সরাসরি কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ (Military Intervention) করার সাহস পাবে না। এর ফলে সীমান্ত এলাকায় চরম অস্থিরতা তৈরি হবে, যার সরাসরি আঁচ এসে লাগবে বাংলাদেশের গায়ে। নতুন করে আরও লাখ লাখ শরণার্থী প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করবে, যা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তাকে ধ্বংস করে দেবে।

আগামীর পথ ও বাংলাদেশের করণীয়

উত্তর কোরিয়া যেভাবে পারমাণবিক বোমার জোরে আমেরিকার মতো পরাশক্তিকে দমিয়ে রাখার মোক্ষম হাতিয়ার পেয়েছে, মিয়ানমারের সামরিক জান্তাও ঠিক সেই পথেই হাঁটছে। আর তাদের এই বিপজ্জনক খেলায় নেপথ্যে সবুজ সংকেত দিয়ে যাচ্ছে চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তি, যারা নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে মিয়ানমারকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে শান্তিকামী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মিয়ানমারের এই পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে বাংলাদেশকে এখনই আন্তর্জাতিক ফোরামে সোচ্চার হতে হবে। জাতিসংঘ, আইএইএ (IAEA) এবং পশ্চিমা বিশ্বকে চাপ দিতে হবে যেন মিয়ানমারের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আন্তর্জাতিক নজরদারি ও কঠোর পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সামরিক একনায়কতন্ত্রের সাথে পারমাণবিক সক্ষমতার মিশ্রণ পুরো মানবজাতির জন্যই এক ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের এখনই এই সম্ভাব্য ‘মারণফাঁদ’ থেকে দেশকে রক্ষায় সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে আগামীর দিনগুলো বাংলাদেশের জন্য হবে অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন সংগ্রাম।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category