টানা কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের বন্যা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য অঞ্চলে চলমান সংকটের মধ্যেই এবার নতুন করে দেশের অন্তত ১৮টি জেলায় বন্যা ছড়িয়ে পড়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) তাদের সর্বশেষ বুলেটিনে এই জেলাগুলোর নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার সৃষ্টি এবং বিদ্যমান পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশের উত্তর-পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদ-নদীর পানি আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে গত পাঁচ দিন ধরে চলা রেকর্ড ভাঙা বৃষ্টিপাত বিগত চার দশকের সমস্ত রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলার অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ সম্পূর্ণ পানিবন্দী হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়, যেখানে প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা বর্তমানে পানির নিচে নিমজ্জিত। এছাড়াও চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং মহানগরীর প্রধান সড়কগুলোতে কোমর পানি জমে যাওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। এই জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জেলার সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাপ্তাহিক ছুটিসহ সব ধরণের ছুটি তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল ঘোষণা করেছেন।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদী সাঙ্গু ও মাতামুহুরী বর্তমানে বান্দরবান, দোহাজারী, লামা ও চিরিঙ্গা পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী দুই দিন সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগসহ ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। এর ফলে ফেনী, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামের গোমতী, মুহুরী ও হালদা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে নতুন নতুন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করতে পারে। এমনকি নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের নিচু এলাকাগুলোও সাময়িকভাবে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই বন্যার তীব্র স্রোতের কারণে চট্টগ্রামের রাউজানে দাদা আনোয়ার হোসেনের পেছনে যাওয়ার সময় নালায় পড়ে মোস্তাকিম নামের তিন বছরের এক শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও বোয়ালখালীর জৈষ্ঠপুরা ভাণ্ডারজুড়ি খালে কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় দিদার আলম হৃদয় নামের এক যুবক ঢলের পানিতে পড়ে নিখোঁজ হয়েছেন।
ভয়াবহ বন্যায় পর্যটন নগরী কক্সবাজারের জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উখিয়া, টেকনাফ, পেকুয়া, রামু ও চকরিয়ার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে কয়েক লাখ মানুষ চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন। অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট পাহাড়ধস এবং বন্যার পানিতে ডুবে জেলাটিতে এ পর্যন্ত শিশুসহ ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ। রেললাইনের ওপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হওয়ার কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়াও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়া-চন্দনাইশ অংশে হাঁটুপানি প্রবাহিত হওয়ায় অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে এবং জোয়ারের পানি বাড়লে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোঃ শরিফ জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৫৭৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে, যেখানে ইতিমধ্যে আট হাজারেরও বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
এদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট বিভাগেও আকস্মিক বন্যার তীব্র পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। মৌলভীবাজারের মনু নদী বিপদসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার এবং ধলাই নদী ৩৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হবিগঞ্জের খোয়াই নদী শহর রক্ষা বাঁধসংলগ্ন এলাকায় বিপদসীমা অতিক্রম করায় শহরবাসীর মনে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। যদিও শায়েস্তাগঞ্জ পয়েন্টে খোয়াই ও সুতাং নদীর পানি এখনও বিপদসীমার কিছুটা নিচে রয়েছে, তবে পাহাড়ি ঢলে পানির উচ্চতা খুব দ্রুত বাড়ছে। সিলেটে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানিও বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। সম্ভাব্য বড় ধরণের দুর্যোগ ও টিলাধসের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সিলেট জেলা প্রশাসন ৫৩৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে এবং ১৬০টি ঝুঁকিপূর্ণ টিলা চিহ্নিত করে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য সতর্কবার্তা জারি করেছে। সুনামগঞ্জ জেলাতেও সুরমা, কুশিয়ারা, যাদুকাটা ও বৌলাই নদীর পানি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় জামালগঞ্জ, তাহিরপুর ও দিরাইসহ সবকটি উপজেলার নিম্নাঞ্চলের হাওরগুলো ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড শহরে ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে, যা চলতি বছরে এ জেলায় সর্বোচ্চ।
দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতেও বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নেওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। একই সাথে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছানোর কারণে নদীসংলগ্ন চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলগুলো সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার কড়া পূর্বাভাস জারি করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। বর্তমানে দেশের অন্তত ১০টি পর্যবেক্ষণ স্টেশনে নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালীতে টানা পাঁচ দিনের অবিরাম বর্ষণ ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের তীব্র স্রোতে গ্রামীণ সরু ছড়াগুলোর বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে হাজার হাজার মানুষের বসতঘর, আবাদি কৃষিজমি এবং মৎস্য প্রজেক্ট ভেসে গিয়ে কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর বাঁশখালীতে তারা আর কখনো এমন ভয়াবহ বন্যা প্রত্যক্ষ করেননি। পানিবন্দী ও সর্বস্ব হারানো গ্রামীণ মানুষগুলোর জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা সুনিশ্চিত করতে অনতিবিলম্বে বাঁশখালীকে অফিশিয়ালি ‘বন্যাদুর্গত এলাকা’ ঘোষণা করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী ও জনপ্রতিনিধিরা।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ, নয়া দিগন্ত