দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ৯০ দিনে বেশ কিছু ইতিবাচক ও জনকল্যাণমুখী উদ্যোগ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে নতুন বিএনপি সরকার। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দেশব্যাপী স্থগিত হয়ে থাকা খাল খনন কর্মসূচির পুনরুজ্জীবন, কৃষিকার্ড এবং ব্যাংক ঋণ মওকুফের মতো প্রধানমন্ত্রীর একাধিক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে বেশ সাড়া ফেলেছে। তবে সরকারের এই নীতিগত গতিশীলতার সমান্তরালে খোদ প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে তথা সচিবালয় ও মাঠ প্রশাসনে এখনো কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ও স্থায়িত্ব ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। উল্টো পদোন্নতি, নিয়োগ এবং বৈষম্যমূলক পদায়ন নিয়ে সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ dāna বেঁধে উঠছে। যার কারণে সরকারের উন্নয়নমূলক ও প্রশাসনিক কাজকর্মে এক ধরনের স্থবিরতা ও গতিহীনতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় এক নজিরবিহীন চিত্র হলো, খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ‘সচিব’ পদটি গত প্রায় তিন মাস ধরে সম্পূর্ণ শূন্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অন্যদিকে, সরকারের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব গ্রহণের ১০৪ দিন পার হয়ে গেলেও খোদ ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু এখনো তাঁর একান্ত সচিব (পিএস) নিয়োগ দেননি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ এই বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, মন্ত্রী কেন পিএস নিচ্ছেন না বা কারিগরি কী জটিলতা রয়েছে, তা তাঁরও জানা নেই। সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মোশাররফ হোসাইন ভূঁইয়ার মতে, পিএস নেওয়া মন্ত্রীদের আইনি প্রিভিলেজ হলেও মন্ত্রণালয় সুচারুভাবে চালাতে পিএস থাকাটাই বাঞ্ছনীয়। তবে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়ার মতে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সচিবের পদ মাসের পর মাস শূন্য থাকা এবং মন্ত্রীদের পিএস না নেওয়া অতিমাত্রায় জনসেবা ও প্রশাসনিক দক্ষতাকে অবহেলা করার শামিল।
প্রশাসনের বর্তমান বিশৃঙ্খলার পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুটি এবং বর্তমান নির্বাচিত সরকারের সময়ে দেওয়া একটি পদোন্নতির তালিকা। এই ৩টি ব্যাচের প্রায় সাত শতাধিক যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রহস্যজনকভাবে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সিভিল সার্ভিসের নিয়ম ভেঙে নিজ ব্যাচের জুনিয়র বা সহকর্মীদের অধীনে পদোন্নতি বঞ্চিত কর্মকর্তাদের সিনিয়র সহকারী সচিব, উপ-সচিব এবং যুগ্ম সচিব হিসেবে কাজ করতে হচ্ছে। এই চরম পেশাগত অসম্মান সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না কর্মকর্তারা, যার ফলে মাঠপর্যায়ে ও ডেস্কে তাঁরা সম্পূর্ণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৪তম ব্যাচের মোট ৩৪৮ জন কর্মকর্তার মধ্যে ১৮৪ জনকে (৫৩ শতাংশ) যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি না দিয়ে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। একইভাবে ৩০তম ব্যাচের ২১১ জনকে উপ-সচিব পদে পদোন্নতি দিলেও বাদ পড়েছেন ৭৭ জন কর্মকর্তা—যা বিগত ৬টি ব্যাচের রেকর্ডেও ঘটেনি। আর বর্তমান সরকারের সময়ে ২০তম ব্যাচকে অতিরিক্ত সচিব করার ক্ষেত্রে ১০০ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হলেও বঞ্চিত হয়েছেন ১৭৯ জন কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময় সুবিধাভোগী আমলাদের একটি বড় অংশ রাতারাতি নিজেদের খোলস ও পোশাক বদলে ‘বিএনপির বেশ’ ধারণ করেছে এবং এরাই পর্দার আড়াল থেকে যোগ্য কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করে সরকারের কল্যাণকর কাজের অন্তরালে বাধার সৃষ্টি করছেন।
হাসিনা সরকারের আমলে সাধারণত একজন সচিবের অবসরে যাওয়ার আগেই পরবর্তী কর্মকর্তার নিয়োগ চূড়ান্ত হতো। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। সকালে কাউকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হলে, বিকেলেই অজ্ঞাত কারণে সেই আদেশ বাতিল হওয়ার মতো খামখেয়ালিপনা প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও উদাসীনতাকেই নির্দেশ করে। যেমন—বাণিজ্য সচিব পদে মো. আতাউর রহমান সরকারকে নিয়োগ দেওয়া হলেও প্রশাসন ক্যাডারের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে তিনি এখনো মন্ত্রণালয়ে যোগদান করতে পারছেন না। তদ্রূপ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালন করা যেসব ডিসিদের মাঠ প্রশাসন থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল, তাদের অনেকেরই পোস্টিং আটকে রয়েছে এবং তারা এখন কোনো দপ্তর না পেয়ে স্রেফ সময় পার করছেন।
নিয়োগ পেয়েও কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারা কর্মকর্তাদের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ। অতিরিক্ত সচিব আফরোজাকে নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দিয়েও তা বাতিল করা হয়। একইভাবে কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানকে পেটেন্ট, শিল্প নকশা ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তরের ডিজি এবং খোন্দকার আনোয়ার হোসেনকে জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও তাঁরা কর্মস্থলে যোগ দিতে পারেননি। এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক রাজা মো. আব্দুল হাইকে এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান, মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনকে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের মহাপরিচালক, মো. শফিকুল ইসলামকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এবং হাসান মাহমুদকে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রার জেনারেল পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও তাঁদের আদেশ বাতিল বা স্থগিত করা হয়।
এই নজিরবিহীন ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ে খোদ জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী ও সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আমলারা যেভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন এবং মেধা ও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষিত হচ্ছে, তা কাম্য নয়। সরকারপ্রধান যেখানে মেধা, দক্ষতা, সততা ও বস্তুনিষ্ঠ কর্মকে প্রশাসনের মূলমন্ত্র ঘোষণা করেছেন, সেখানে মাঠপর্যায়ের কাজের সাথে নীতিমালার এই অমিল দ্রুত দূর করা না গেলে প্রশাসনের অভ্যন্তরে অন্তর্ঘাত ও ক্ষোভ আরও তীব্র রূপ ধারণ করবে।