• বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ০৫:২৩ অপরাহ্ন
Headline
দেশে হাম ও উপসর্গে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত দেড় হাজারেরও বেশি ৭ জানুয়ারি এসএসসি এবং ৬ জুন এইচএসসি শুরু রেকর্ড ঋণের বিলাসী বাজেট: চরম অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের বিপর্যয়: ৬৪ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি ও টিকে থাকার লড়াই সংবিধান সংশোধন: সংসদের বিশেষ কমিটি বর্জনের পথে জামায়াত ও এনসিপি বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল শহর ঢাকা, ২০৫০ সালে উঠবে শীর্ষে: জাতিসংঘ ফারাক্কার একচেটিয়া প্রভাব ঠেকাতে এবার ‘পদ্মা ব্যারাজ’ সীমান্তে কৃষকদের খাদ্য ও কৃষি নিরাপত্তা নেই: এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: জাতীয় পার্টির খরচ মাত্র ৫ লাখ টাকা ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: ইরাক ও মরক্কো দলের অফিশিয়াল এআই স্পনসর গুগল জেমিনি

ফারাক্কার একচেটিয়া প্রভাব ঠেকাতে এবার ‘পদ্মা ব্যারাজ’

Reporter Name / ১ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, পরিবেশগত বিপর্যয় এবং প্রতি বছর ফিরে আসা দুর্যোগের হাত থেকে দেশকে রক্ষার জন্য অবশেষে এক যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাব এবং এর ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম বন্যা ও খরা পরিস্থিতি থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে দেশের অভ্যন্তরে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নির্মাণের এক মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর বর্ষাকালে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং অতিরিক্ত পানির চাপে ভারত যখন ফারাক্কা বাঁধের সব কটি গেট একসঙ্গে খুলে দেয়, তখন বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা, বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত হয়। এর ফলে এই অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রায় নেমে আসে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। আবার শুষ্ক মৌসুমে যখন পানির তীব্র হাহাকার দেখা দেয়, তখন ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে খা খা প্রান্তরে পরিণত হয়। এই দ্বিমুখী সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে এবং শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে স্বাদু পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থেকেই এই বিশাল প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে।

দেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখার স্বার্থে বুধবার সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সভায় প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সার্বিকভাবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি বাস্তবায়ন করতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ৫০ হাজার ৪৪৩ (পঞ্চাশ হাজার চারশ তেতাল্লিশ) কোটি টাকা। সম্পূর্ণ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সমন্বয়ে এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার দেশের পানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি স্বনির্ভর ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই ব্যারাজ নির্মিত হলে তা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ এবং কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হবে।

প্রধান এই প্রকল্পের কারিগরি ও অবকাঠামোগত নকশার দিকে তাকালে এর বিশালত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এই ব্যারাজটি রাজবাড়ী জেলার পাংশা পয়েন্টে নির্মাণ করা হবে, যার মোট দৈর্ঘ্য হবে ২.১ (দুই দশমিক এক) কিলোমিটার। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও বর্ষাকালের অতিরিক্ত পানি সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য এই ব্যারাজে মোট ৭৮টি অত্যাধুনিক স্পিলওয়ে গেট স্থাপন করা হবে। এর পাশাপাশি নদীর তলদেশের পলি ব্যবস্থাপনা এবং পানি নিষ্কাশনের সুবিধার্থে আরও ৭৮টি আন্ডার স্লুইস গেট সংযুক্ত থাকবে। নদীমাতৃক এই দেশে নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সেজন্য এই ব্যারাজে ১৪ মিটার প্রস্থের একটি নেভিগেশন লক বা নৌ-চলাচলের বিশেষ পথ রাখা হয়েছে। এর ফলে বড় বড় কার্গো ও যাত্রীবাহী নৌযান অনায়াসেই এই ব্যারাজ অতিক্রম করতে পারবে। এছাড়া, নদীর স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান এবং ইলিশসহ অন্যান্য দেশীয় মাছের অবাধ বিচরণের বিষয়টি মাথায় রেখে দুটি ২০ মিটার প্রশস্ত ফিশ পাস বা চ্যানেল রাখা হয়েছে, যা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সুবিধাভোগী এলাকা এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাবের বিষয়টি অত্যন্ত ব্যাপক। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, প্রকল্পটি বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকাজুড়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই বিশাল এলাকাটি দেশের ৪টি বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ২৬টি জেলার ১৩০টি উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলেই দেশের ৪টি বিভাগের ১৯টি জেলার প্রায় ১০০টি উপজেলায় এর সুফল সরাসরি দৃশ্যমান হবে। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গড়াই, মধুমতী, ভৈরব, কপোতাক্ষসহ অসংখ্য মৃতপ্রায় নদীতে পুনরায় স্বাদু পানির প্রবাহ ফিরে আসবে। মিঠা পানির এই নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত হলে ওই অঞ্চলে সমুদ্রের লোনা পানি প্রবেশের হার ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। এর ফলে কৃষিজমিতে লবণাক্ততার অভিশাপ দূর হবে, হাজার হাজার হেক্টর অনাবাদি জমি পুনরায় চাষের আওতায় আসবে এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা পাবে। সংশ্লিষ্টরা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছেন, পুরো প্রকল্পটি শতভাগ বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি এর সুফল ভোগ করবে, যা জাতীয় জিডিপিতে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

তবে এত বিপুল সম্ভাবনা ও আশাবাদের মধ্যেও এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও অনিশ্চয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ সংক্রান্ত ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং পানিবণ্টন চুক্তির ভবিষ্যৎ। নদীর উজানে থাকা শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশের এক দীর্ঘ ও জটিল কূটনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ তার ন্যায্য হিস্যা থেকে বারবার বঞ্চিত হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে যে ঐতিহাসিক ‘গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তির সময়সীমা শেষ হতে যাচ্ছে চলতি বছরের (২০২৬ সালের) ডিসেম্বর মাসেই। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে বাংলাদেশের নিজস্ব ভূখণ্ডে এ ধরনের একটি মেগা ব্যারাজ নির্মাণের উদ্যোগ স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিক পানি-রাজনীতি বা ‘হাইড্রো-পলিটিক্স’-এ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন বা নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং নিজেদের পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী ‘বারগেইনিং টুল’ বা দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারে। ভারত যদি চুক্তির নবায়নে অনীহা দেখায় বা শুষ্ক মৌসুমে ন্যায্য হিস্যা প্রদানে টালবাহানা করে, তবে পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে বাংলাদেশ বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমের জন্য নিজস্ব একটি টেকসই বাফার জোন বা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে সক্ষম হবে। তবে এর জন্য সরকারকে অত্যন্ত বিচক্ষণতা, দৃঢ়তা এবং আন্তর্জাতিক পানি আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে সামনের দিনগুলোতে কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সর্বজনীন নদীর পানিতে নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যে অবিচ্ছেদ্য অধিকার রয়েছে, সেটি আন্তর্জাতিক মহলে জোরালোভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি পদ্মা ব্যারাজের মতো নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্পগুলোকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান করতে হবে।

পরিশেষে, ফারাক্কার অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে পদ্মা ব্যারাজ কেবল একটি ইটের গাঁথুনি বা কংক্রিটের কাঠামো নয়, এটি বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা এবং অস্তিত্ব রক্ষার এক চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রতীক। শুষ্ক মৌসুমে কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার সুরক্ষা এবং বর্ষায় বন্যার তাণ্ডব থেকে জনপদকে বাঁচানোর এই সমন্বিত উদ্যোগ সফল হলে তা দেশের কৃষি-অর্থনীতিতে একটি নীরব বিপ্লব ঘটাবে। সরকারের এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং প্রকল্পের স্বচ্ছ বাস্তবায়ন আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ উপহার দিতে সক্ষম হবে।

তথ্যসূত্র: এশিয়া পোস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category