• বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ১২:০৬ পূর্বাহ্ন

রেকর্ড ঋণের বিলাসী বাজেট: চরম অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা

Reporter Name / ৩৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬

দেশের অর্থনীতি যখন কঠিন সংকটের মুখে এবং রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে, ঠিক তখনই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এক উচ্চাভিলাষী বা ‘বিলাসী’ বাজেট দিতে যাচ্ছে সরকার। বিশাল এই বাজেটের ঘাটতি মেটাতে সরকার দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাজেটের রূপরেখা ও ঋণের নির্ভরতা

নতুন অর্থবছরের (২০২৬-২৭) বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বিশাল এই বাজেটের ঘাটতি পূরণে মূলত ঋণের ওপরই ভরসা করছে সরকার:

  • বৈদেশিক ঋণ: ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা

  • অভ্যন্তরীণ ঋণ: ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা

  • বাজেট সহায়তা (সম্ভাব্য): প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা

ইআরডি সূত্র বলছে, আগামী অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সংশোধিত এডিপির তুলনায় এবার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা বাড়ছে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা (প্রায় ৫২ শতাংশ বেশি)।

বৈদেশিক ঋণের পাহাড় ও পরিশোধের চাপ

সরকার যখন নতুন করে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে, ঠিক তখনই পুরনো ঋণ পরিশোধের চাপ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

  • সামনের ৫ বছরের চাপ: ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে বাংলাদেশকে মোট প্রায় ২৫.৯৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে (এর মধ্যে আসল ১৮.৩৮ বিলিয়ন এবং সুদ ৭.৬ বিলিয়ন ডলার)।

  • সর্বোচ্চ চাপের বছর: শুধু ২০২৯-৩০ অর্থবছরেই প্রায় ৫.৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে।

  • বর্তমান পরিস্থিতি: সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বাংলাদেশকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪০৯ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বড় বড় মেগা প্রকল্পগুলোর ‘গ্রেস পিরিয়ড’ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন থেকে আসল ঋণ পরিশোধ শুরু হবে। প্রকল্পগুলোর সুফল পুরোপুরি না পাওয়ায় ঋণের এই চাপ অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

রাজস্ব ধস ও ব্যাংকঋণের লাগামহীন অবস্থা

অর্থনৈতিক বাস্তবতায় রাজস্ব আদায়ের গতি অত্যন্ত হতাশাজনক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আট মাসের হিসাবে, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। রাজস্বের এই বেহাল দশার কারণে সরকার দৈনন্দিন ও উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে দেশীয় ব্যাংকব্যবস্থার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সরকার ব্যাংক থেকে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা পুরো বছরের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আইএমএফের চাপ ও মূল্যস্ফীতির শঙ্কা

বর্তমানে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ২৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এদিকে সংস্কার ও শর্ত বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে আইএমএফের ৪.৭৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের পরবর্তী কিস্তি পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আইএমএফের চাপে ও আর্থিক ঘাটতি সামাল দিতে সরকার সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে, যা বাজারে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগামী বাজেটে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ ও সতর্কতা

অর্থনীতিবিদরা এই ঋণনির্ভর বাজেট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

  • সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশ যেন ঋণ ফাঁদে না পড়ে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকারের সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া উচিত সম্পদ আহরণ ও রাজস্ব বাড়ানোর দিকে।”

  • বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “শুধু ঋণ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর কোথায় কী চাপ তৈরি হচ্ছে, তার স্পষ্ট মূল্যায়ন এবং সমন্বিত সংস্কার জরুরি।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং নতুন বেতন-কাঠামোর চাপ সামলাতে গিয়ে এখনই কাঠামোগত সংস্কার না হলে এই ‘বিলাসী বাজেট’ ভবিষ্যতে দেশকে এক বড় ধরনের আর্থিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category