মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্যেই ইসরায়েলের পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এ পাস হওয়া নতুন একটি ‘মৃত্যুদণ্ড আইন’ পরিস্থিতিকে আরও চরম আকার ধারণ করিয়েছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে প্রণীত এই বিতর্কিত আইনটিকে মানবাধিকার সংস্থাগুলো ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আইনি বৈধতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্বনেতারা একে আধুনিক সভ্যতার এক ‘ভয়াবহ পশ্চাদগমন’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
গতকাল সোমবার (৩০ মার্চ) নেসেটে ৬২-৪৮ ভোটে এই বিলটি পাস হয়। এই আইন অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরের কোনো ফিলিস্তিনি যদি ইসরায়েলি নাগরিকদের হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন, তবে তার সরাসরি ফাঁসির সাজা হবে। কট্টর ডানপন্থী ইসরায়েলি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির এই আইনের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন। বিলটি পাস হওয়ার পর তাকে সংসদ কক্ষেই শ্যাম্পেন দিয়ে উল্লাস করতে দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রবল আপত্তি ও আইন প্রত্যাহারের আহ্বান দম্ভভরে প্রত্যাখ্যান করে বেন-গভির সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন:
“আমরা ইতিহাস গড়েছি। যারা আমাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করছেন এবং হুমকি দিচ্ছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সেই সব মানুষকে বলছি— আমরা ভয় পাই না, আমরা মাথা নত করব না।”
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ): এই আইনকে একটি ‘বিপজ্জনক উসকানি’ হিসেবে নিন্দা জানিয়ে তারা বলেছে, এটি ইসরায়েলি ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার আসল চেহারা উন্মোচিত করেছে, যা আইনের আড়ালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে চায়।
হামাস: এই সিদ্ধান্তকে ‘বিপজ্জনক নজির’ আখ্যা দিয়ে গোষ্ঠীটি জাতিসংঘ ও রেডক্রসকে ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনিদের রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
মুস্তফা বারঘুতি (ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভ): তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই আইনটি মূলত ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বন্দি ও কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করবে, যা ইসরায়েলি ব্যবস্থার ভেতরে ‘ফ্যাসিবাদী পরিবর্তনের’ গভীরতা প্রতিফলিত করে।
ফিলিস্তিনি সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস: গাজা-ভিত্তিক সংস্থাটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা কেবল ইসরায়েলি অপরাধীদের দায়মুক্তিকেই আরও গভীর করবে।
জাতিসংঘ মানবাধিকার অফিস: ফিলিস্তিনে অবস্থিত সংস্থাটি ইসরায়েলকে অবিলম্বে এই ‘বৈষম্যমূলক মৃত্যুদণ্ড আইন’ বাতিলের আহ্বান জানিয়েছে। তারা সতর্ক করেছে যে, শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রয়োগের জন্য প্রণীত এই আইনটি বর্ণবিদ্বেষ ও বর্ণবাদকে আরও শক্তিশালী করবে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল: বিশ্বখ্যাত এই সংস্থাটি নতুন আইনটিকে ‘নৃশংসতা, বৈষম্য এবং মানবাধিকারের প্রতি চরম অবজ্ঞার প্রকাশ’ বলে বর্ণনা করেছে।
ইতালীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি: তিনি জানান, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য সম্মিলিতভাবে ইসরায়েল সরকারকে বিলটি তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল। তিনি বলেন, “শাস্তির নামে কারও প্রাণ কেড়ে নেওয়ার অধিকার নিজের হাতে তুলে নেওয়া একটি অমানবিক কাজ, যা মানুষের মর্যাদাকেই অপমান করে।”
কাউন্সিল অব ইউরোপ: সংস্থাটির মহাসচিব অ্যালেইন বারসেট এই আইনকে ‘মারাত্মক পশ্চাদগমন’ বলে অভিহিত করে জানান, মৃত্যুদণ্ড একটি সেকেলে আইনি ব্যবস্থা যা সমসাময়িক মানবাধিকারের সঙ্গে বেমানান।
আয়ারল্যান্ড: দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেলেন ম্যাকএন্টি ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে এই বিলের বৈষম্যমূলক প্রকৃতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গাজায় চলমান যুদ্ধের আবহে এবং পশ্চিম তীরে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে ব্যাপক ধরপাকড়ের মধ্যেই এমন একটি আইন পাস হওয়া পুরো অঞ্চলের জন্য একটি অশনিসংকেত। ইতিমধ্যে ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর সিভিল রাইটস ইন ইসরায়েল’ এই আইনের বিরুদ্ধে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছে।