দেশের জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বেতন বকেয়া, দীর্ঘদিনের পদোন্নতি জটিলতা এবং চাকরির স্থায়ীকরণের দাবিতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী, পরিদর্শক ও পোর্টাররা। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে অর্থাৎ ২৫ এপ্রিলের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে সারা দেশের ১ লাখ ২০ হাজার টিকাকেন্দ্রে কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ বা ‘শাটডাউন’ করার চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। এতে আগামী ৩ মে থেকে শুরু হতে যাওয়া দেশব্যাপী বিশেষ হামের টিকাদান কর্মসূচি থমকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কাঁধে করে টিকার বক্স বহনকারী ‘পোর্টাররা’ গত ৯ মাস ধরে কোনো বেতন পাচ্ছেন না। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এবং ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত তাদের পারিশ্রমিক বকেয়া রয়েছে।
বান্দরবানের দুর্গম এলাকা থেকে আসা পোর্টার সমীর চক্রবর্তী তাঁর দুর্দশার কথা তুলে ধরে বলেন, “পাহাড়ি এলাকায় ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও কাঁধে টিকার বাক্স নিয়ে আমাদের কেন্দ্রে কেন্দ্রে যেতে হয়। ৩০ দিন কাজ করলেও টাকা পাই ২২ দিনের। এর মধ্যে ৯ মাস বেতন নেই। আমার ঘর নেই, বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে অথচ দারিদ্র্যের কারণে কিছুই করতে পারছি না।”
জানা গেছে, পোর্টাররা দৈনিক মাত্র ৭০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন। বর্তমানে সারা দেশে পোর্টারদের বকেয়া বেতন বাবদ ১৯ কোটি ২৫ লাখ ৭৩ হাজার টাকা বরাদ্দ চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইপিআই শাখা মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে।
সারা দেশের প্রায় ১৫ হাজার স্বাস্থ্য সহকারী, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্য পরিদর্শকরা বিগত এক বছর ধরে ৬ দফা দাবিতে আন্দোলন করছেন। তাদের মূল অভিযোগ, একই সময়ে অন্যান্য সরকারি দপ্তরে যোগদানকারীরা পদোন্নতি পেয়ে গ্রেড পরিবর্তন করলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বর্তমানে তারা তিনটি দাবিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন: ১. বেতন গ্রেড ১৬ থেকে ১৪-তে উন্নীত করা এবং গেজেট প্রকাশ। ২. স্বাস্থ্য সহকারীদের ‘টেকনিক্যাল’ পদমর্যাদা প্রদান। ৩. নিয়োগবিধি সংশোধন করে আবেদনের যোগ্যতা স্নাতক করা।
ঢাকা বিভাগ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহাদুল ইসলাম রিপন বলেন, “সরকার কেবল সংকটের সময় আমাদের সাথে বসে, পরে ভুলে যায়। বর্তমানে আমাদের ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ঝুলে আছে। ২৫ এপ্রিলের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে আমরা কঠোরতম কর্মসূচিতে যাব।”
চলমান হাম সংকট ও টিকাদান কর্মসূচি সফল করতে গত ২ এপ্রিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৫ দিনের মধ্যে সুপারিশ জমা দেওয়ার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হানকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটি ৬ এপ্রিল একটি বৈঠক করার কথা থাকলেও তা অনুষ্ঠিত হয়নি। এতে আন্দোলনরত নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান সমন্বয়কারী মো. ওয়াসি উদ্দিন রানা জানান, কর্মকর্তারা আশ্বাস দেন ঠিকই, কিন্তু পরে সব ঝুলে থাকে। এবার আর আশ্বাসে কাজ হবে না, দৃশ্যমান অগ্রগতি না এলে টিকাদান শাটডাউন ছাড়া পথ নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান স্বীকার করেছেন যে, পোর্টারদের বেতন বকেয়া এবং স্বাস্থ্য সহকারীদের পদোন্নতির দাবিগুলো যৌক্তিক। তিনি বলেন, “তারা অনেক কষ্টে ভ্যাকসিন সরবরাহ করেন। আমরা মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছি। তবে একটি নতুন পদ সৃষ্টি বা পদোন্নতির প্রক্রিয়া প্রশাসনিকভাবে দীর্ঘমেয়াদী কাজ, যা সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন।”
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম সফল অর্জন হলো টিকাদান কর্মসূচি। আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত এই কর্মসূচি যদি ১৫ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর অসহযোগিতার কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তবে দেশের কোটি কোটি শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভয়াবহ হুমকি তৈরি হবে। বিশেষ করে হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবের মধ্যে টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ হলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেও রাজপথের আন্দোলনকারীরা এখন ‘দৃশ্যমান গেজেট’ না আসা পর্যন্ত কর্মসূচি প্রত্যাহারে নারাজ। আগামী ২৫ এপ্রিলের সময়সীমার মধ্যে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশের টিকাদান কর্মসূচিতে যে দীর্ঘমেয়াদী অন্ধকার নেমে আসবে, তার মাসুল দিতে হবে দেশের সাধারণ মানুষকে।