দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কয়েক দশকের শীতল সম্পর্ক ও কূটনৈতিক দূরত্বের পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক উষ্ণ হতে শুরু করেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে জোর গুঞ্জন উঠেছে যে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির খুব শিগগিরই তিন দিনের এক উচ্চপর্যায়ের সফরে ঢাকায় আসছেন। তবে এই সফরের মূল আকর্ষণ শুধু বাণিজ্য বা অর্থনীতি নয়; বরং ড্রোন প্রযুক্তি ও মিসাইল সিস্টেমের মতো স্পর্শকাতর সামরিক সহায়তা চুক্তি। আর এই সম্ভাবনা ঘিরেই সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতে।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭১ সালের পর থেকে ঢাকা ও ইসলামাবাদের সম্পর্কে যে ঐতিহাসিক টানাপোড়েন ছিল, তা সম্প্রতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক ধরনের ভারসাম্য বা ডাইভারসিফিকেশন (বৈচিত্র্য) আনার চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘ইসলামাবাদ পোস্ট’-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা তারেক রহমানের একটি সম্ভাব্য চীন সফরের পরপরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের এই ঢাকা সফরের কথা রয়েছে। এত দিন ঢাকার ওপর দিল্লির যে একচ্ছত্র প্রভাব ছিল, সেখানে বেইজিং ও ইসলামাবাদের এই নতুন তৎপরতা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যকে নতুন রূপ দিতে পারে। ভারতের উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তে আগে থেকেই যে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ ছিল, ঢাকার এই কূটনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে ভারতের পূর্ব সীমান্তেও এখন নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে।
সম্ভাব্য এই সফরের আলোচ্যসূচি বেশ বড় ও উচ্চাভিলাষী বলে জানা গেছে। প্রথমত, দুই দেশ বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে অত্যন্ত আগ্রহী। পাকিস্তান চাইছে বাংলাদেশের বিশাল টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাতের সাথে যুক্ত হতে, আর বাংলাদেশও পাকিস্তানের বাজারে নিজেদের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়াতে ইচ্ছুক। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানার (বিওএফ) আধুনিকায়নে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে। এর ফলে বাংলাদেশ নিজস্ব প্রযুক্তিতে ড্রোন, মিসাইল সিস্টেম, গোলাবারুদ এবং অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে। এর পাশাপাশি দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে যৌথ প্রশিক্ষণ, সামরিক কর্মকর্তাদের আদান-প্রদান এবং নিরাপত্তা সমন্বয় বৃদ্ধির মতো গভীর সামরিক সম্পর্কেরও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
তবে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এটি একটি বড় পরীক্ষার বিষয়। মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে—পাকিস্তানের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক কতটা গভীরে যাবে, তা নিয়ে দেশের ভেতরে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হতে পারে। একদিকে দেশের ভেতরের জনআবেগ এবং অন্যদিকে বাইরের ভূরাজনৈতিক চাপ, এই দুইয়ের মধ্যে সরকার কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এদিকে, এই গুঞ্জনের ডালপালা বিস্তারের মাঝেই ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তান হাইকমিশন খবরটি নাকচ করে দিয়েছে। পাকিস্তান হাইকমিশনের এক মুখপাত্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধানের ঢাকা সফরের এমন কোনো পরিকল্পনার কথা তাদের জানা নেই। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো সফরের কথা নিশ্চিত করা হয়নি। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-করাচি সরাসরি বিমান ও জাহাজ চলাচল শুরু হওয়া এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে দুই দেশের কাছাকাছি আসার এই প্রক্রিয়া যে এই দশকের অন্যতম বড় ভূরাজনৈতিক ঘটনা, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের কোনো সন্দেহ নেই।
তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪