• রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ০৪:৫২ পূর্বাহ্ন
Headline
পায়ের নিচে পৃথিবী বিদ্যুৎ সঞ্চালনে ধারাবাহিক লোকসান: ঋণ ৬০ হাজার কোটি, সংকটে পাওয়ার গ্রিড সুপার এল নিনোর ছায়া ও জলবায়ুর খামখেয়ালিপনা: চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ নাইজেরিয়ায় স্কুলে বন্দুকধারীদের তাণ্ডব: ক্লাস চলাকালে বহু শিক্ষার্থী অপহরণ হরমুজ প্রণালী নিয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাবে ইরানের তীব্র ক্ষোভ, বিশ্ববাসীকে ‘কঠোর বার্তা’ তেহরানের ট্রাম্প ফিরতেই বেইজিং যাচ্ছেন পুতিন: দুই পরাশক্তির বৈঠকে নজর বিশ্ব মহলের নগরের দায়িত্ব পেলে নাগরিক সেবাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবো: সাদিক কায়েম আস্থার চরম সংকটে দেশের আর্থিক খাত: ৬৬% ব্যাংকই দুর্বল, আসল টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কা নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল ঘোষণা পাকিস্তানের, পাঁচ নতুনের অভিষেক বিসিবির অ্যাডহক কমিটি বাতিলের দাবিতে এবার বুলবুল-ফারুকদের রিট

বাঙালির ফুটবল উন্মাদনায় আইনি দেয়াল: বাংলাদেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচার কেন অনিশ্চিত?

ক্রীড়া প্রতিবেদক / ৪ Time View
Update : শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হতে আর বেশিদিন বাকি নেই। চার বছরের অপেক্ষার পর বিশ্বজুড়ে যখন ফুটবল-জ্বর নামার প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর জন্য ভেসে এলো এক চরম দুঃসংবাদ। প্রতিবার ড্রয়িংরুমে বসে কিংবা মহল্লার বড় পর্দায় যারা বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ উপভোগ করেন, এবার তাঁদের সেই আনন্দের ওপর ঝুলছে অনিশ্চয়তার কালো ছায়া। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীন শেষ মুহূর্তে তাদের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম ‘চায়না মিডিয়া গ্রুপ’-এর মাধ্যমে জটিলতা কাটিয়ে উঠলেও, ভারত এবং বাংলাদেশের আকাশে এখনো কাটেনি শঙ্কার মেঘ। কিন্তু কোটি ফুটবলপ্রেমীর এই দেশে বাধাটা আসলে কোথায়?

টেন্ডার প্রক্রিয়া ও বাংলাদেশের অনুপস্থিতি

ফিফা বিশ্বকাপের আয়ের সিংহভাগ আসে টেলিভিশন ও ডিজিটাল সম্প্রচার স্বত্ব (Broadcasting Rights) বিক্রি থেকে। ফিফা সাধারণত উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক টেন্ডার বা দরপত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন মহাদেশ বা আঞ্চলিক টেরিটরির (অঞ্চল) জন্য এই স্বত্ব বিক্রি করে। যে কোম্পানি এই টেন্ডার জেতে, তারা পরবর্তীতে ওই অঞ্চলের নির্দিষ্ট দেশগুলোর টেলিভিশন বা ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্মের কাছে খেলা দেখানোর স্বত্ব পুনরায় বিক্রি করে।

দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ফিফার মূল টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি। ফলে, বাংলাদেশের ভাগ্য এখন নির্ধারণ করছে বিদেশি মধ্যস্বত্বভোগী প্রতিষ্ঠান।

২০০ কোটির ‘স্প্রিংবক’ ফাঁদ!

এবারের বিশ্বকাপের জন্য বাংলাদেশ অঞ্চলের টিভি ও ডিজিটাল রাইটস কিনে নিয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্পোর্টস মার্কেটিং কোম্পানি ‘স্প্রিংবক’। আর এখানেই তৈরি হয়েছে মূল জটিলতা। স্প্রিংবক বাংলাদেশে এই প্রচারস্বত্ব বিক্রির জন্য ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ প্রায় ২০০ কোটি টাকা দাবি করছে।

বাংলাদেশি চ্যানেল বা স্পোর্টস প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য এই অঙ্কটা আকাশচুম্বী। দেশের একমাত্র ডেডিকেটেড স্পোর্টস চ্যানেল ‘টি স্পোর্টস’-এর প্রধান নির্বাহী (সিইও) ইশতিয়াক সাদেক এই বিষয়ে কথা বলতে স্বয়ং সিঙ্গাপুরে গেলেও চড়া দামের কারণে শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি ছাড়াই ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। কয়েক মাস আগে যাত্রা শুরু করা নতুন চ্যানেল ‘স্টার নিউজ’ও খেলা সম্প্রচারে আগ্রহী ছিল, কিন্তু বিপুল অঙ্কের খরচের হিসাব মেলাতে না পেরে তারাও পিছু হটেছে।

ব্যয় তোলা কেন অসম্ভব? ব্যবসায়িক সমীকরণ

দেশীয় চ্যানেলগুলো কেন এত টাকা দিয়ে স্বত্ব কিনতে ভয় পাচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে নিখুঁত ব্যবসায়িক হিসাব:

  • বিজ্ঞাপনের মন্দা বাজার: বাংলাদেশের বর্তমান বিজ্ঞাপনের বাজার থেকে ২০০ কোটি টাকা লগ্নি করে তা তুলে আনা প্রায় অসম্ভব।

  • সময়ের ব্যবধান: বিশ্বকাপের অনেকগুলো ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে গভীর রাতে কিংবা একদম ভোরে। ফলে প্রাইম-টাইমের মতো দর্শক বা বিজ্ঞাপন পাওয়া যাবে না।

বিটিভি ও ফ্রি টু এয়ার (Terrestrial) সুবিধা বন্ধ

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, রাষ্ট্রীয় চ্যানেল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) তো সবসময়ই খেলা দেখায়, এবার কেন নয়? আসলে, অতীতে ফিফা প্রতিটি দেশের রাষ্ট্রীয় চ্যানেলকে নামমাত্র মূল্যে বা বিনামূল্যে ‘টেরিস্ট্রিয়াল রাইটস’ (বিনা ডিশ লাইনে খেলা দেখার সুবিধা) দিত। কিন্তু ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ থেকে ফিফা এই নিয়ম পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। এখন বিটিভিকেও চড়া দামেই স্বত্ব কিনতে হয়। ২০২২ সালে ‘তমা কনস্ট্রাকশন’ নামক একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান স্বত্ব কিনে বিটিভির কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করেছিল, যা নিয়ে সে সময় ব্যাপক সমালোচনাও হয়েছিল।

সরকারের তৎপরতা ও সমন্বয় কমিটি

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের ফুটবলপ্রেমীদের হতাশা দূর করতে মাঠে নেমেছে সরকার। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এই বিষয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে ফিফা বিশ্বকাপের সম্প্রচারের প্রচারস্বত্ব পাওয়ার জন্য একটি বিশেষ সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি বিষয়টি খতিয়ে দেখে একটি সুপারিশ দেবে এবং সেই অনুযায়ী সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।” তবে বিটিভির মহাপরিচালক (ডিজি) মো. মাহবুবুল আলমের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সমাধানের পথ কী?

স্পোর্টস মার্কেটিং ও টিভি স্বত্ব নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা বাফুফের বর্তমান সহ-সভাপতি ফাহাদ করিম পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, “ফিফার স্বত্বের দাম দিন দিন বাড়ছে। এবার এই অঞ্চলের জন্য যারা স্বত্ব কিনেছে, তারা অতিরিক্ত মুনাফা করতে চাওয়ায় এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তে বেসরকারি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই ব্যয়ভার বহন করা অসম্ভব।” তবে তিনি মনে করেন, দেশের মানুষের আবেগের কথা বিবেচনা করে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ বা ‘কনসোর্টিয়াম’ (যৌথ অর্থায়ন) গঠন করা গেলে এখনো খেলা সম্প্রচার করা সম্ভব।

ফুটবল বাংলাদেশের মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বিশ্বকাপ এলে এ দেশের মানুষ আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল কিংবা অন্যান্য দলে বিভক্ত হয়ে যে উন্মাদনা তৈরি করে, তা খোদ ফিফারও নজর কেড়েছে। অথচ ২০২৬ সালেও এসে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দূরদর্শিতার অভাব এবং বিদেশি কোম্পানির অতি-মুনাফার লোভের কারণে সেই খেলা দেখা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, তা মেনে নেওয়া কঠিন। সরকার গঠিত সমন্বয় কমিটি দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নিয়ে সিঙ্গাপুরের কোম্পানির সাথে দরকষাকষি করবে এবং বাঙালির ড্রয়িংরুমে বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ ফিরিয়ে আনবে—এটাই এখন দেশের কোটি ফুটবল ভক্তের একমাত্র প্রত্যাশা।



আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category