দেশের জ্বালানি খাতে বর্তমানে এক ভয়াবহ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে, যার মূল শিকার হচ্ছেন প্রান্তিক থেকে শুরু করে শহুরে মধ্যবিত্ত সাধারণ ভোক্তারা। পাইপলাইনের গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ এখন রান্নাবান্না থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা কাজে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। কিন্তু এই নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী চক্র এলপিজির বাজারে এক কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে, যার ফলে বাজারে গ্যাস সিলিন্ডারের দাম আকাশচুম্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি কর্তৃক নির্ধারিত ন্যায্যমূল্যের তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো দাম হাঁকিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা হচ্ছে। এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির নেপথ্যে কোনো আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকট বা ডলারের মূল্যবৃদ্ধি নয়, বরং দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি এলপিজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সুপরিকল্পিত কারসাজি ও মজুতদারির তথ্য উঠে এসেছে। বাজার নিয়ন্ত্রণের এই অশুভ খেলার প্রমাণ মিলেছে খোদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ গোয়েন্দা সংস্থার একটি অত্যন্ত গোপনীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিবেদনে, যা দেশের জ্বালানি খাতের সুশাসন নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা বা এনএসআই সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি বিশদ ও বিস্ফোরক গোয়েন্দা প্রতিবেদন দাখিল করেছে। গত বৃহস্পতিবার জমা দেওয়া এই প্রতিবেদনে দেশের এলপিজি বাজারের শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি বৃহৎ কোম্পানির নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই কোম্পানিগুলো হলো—আইগ্যাজ, ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি এবং যমুনা। গোয়েন্দা সংস্থার ওই প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এই নামিদামি প্রতিষ্ঠানগুলো গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে তাদের আমদানি করা এলপিজি কার্গো স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাজারে না ছেড়ে সুকৌশলে মজুত করে রেখেছে। অর্থাৎ, বাজারে গ্যাসের পর্যাপ্ত চাহিদা থাকা সত্ত্বেও তারা কৃত্রিমভাবে সরবরাহের চেইন বা শৃঙ্খলকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এই বিপুল পরিমাণ গ্যাস আটকে রাখার কারণে দেশজুড়ে ডিলার, সাব-ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতাদের কাছে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেয়, যা মুহূর্তের মধ্যে ভোক্তাপর্যায়ে চরম আতঙ্ক ও মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে দেয়।
কেন হঠাৎ করে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে এই মজুতদারির মহোৎসব শুরু হলো, তার পেছনের কারণটি অত্যন্ত সুচিন্তিত এবং শতভাগ মুনাফাকেন্দ্রিক। আন্তর্জাতিক বাজারের হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী, অক্টোবর মাস থেকে এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রে টনপ্রতি প্রিমিয়াম বা বাড়তি মূল্য প্রায় ৬৪ মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ছিল। এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, মূলত এই বর্ধিত প্রিমিয়ামের সম্পূর্ণ অনৈতিক সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার জন্যই কোম্পানিগুলো সেপ্টেম্বর মাসে কম দামে আমদানি করা গ্যাস বাজারে ছাড়েনি। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, অক্টোবরে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রিমিয়াম বাড়বে, তখন তারা তাদের মজুত করা কম দামের গ্যাস নতুন ও চড়া দামে বাজারে বিক্রি করে রাতারাতি বিপুল অঙ্কের অবৈধ মুনাফা পকেটে পুরবে। একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ে এমন ছক কষা মজুতদারি কেবল অনৈতিকই নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলার শামিল।
বাজারের এই কৃত্রিম সংকটের বাস্তব চিত্র এবং আমদানি পরিসংখ্যানের মধ্যে এক বিশাল ও রহস্যময় বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। এনএসআই তাদের প্রতিবেদনে সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশে মোট এলপিজি আমদানি হয়েছে প্রায় এক লাখ ৫৮ হাজার টন। এর আগের মাস, অর্থাৎ আগস্টে এই আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় এক লাখ ৫৭ হাজার টন। অর্থাৎ, পরিসংখ্যানগতভাবে দেশে এলপিজির কোনো ঘাটতি তো নেই-ই, বরং আগের মাসের তুলনায় আমদানি সামান্য বৃদ্ধিই পেয়েছে। তা সত্ত্বেও ভোক্তাদের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় হয়েছে। বিইআরসি সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজি ওজনের একটি আদর্শ এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল এক হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু বাস্তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ ভোক্তাদের সেই একই সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে দুই হাজার টাকারও বেশি মূল্যে। আমদানি পর্যাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও ভোক্তাকে কেন এত চড়া দাম দিতে হবে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিত হয়েছে যে, বাজারে সরবরাহ সংকটের পুরো বিষয়টিই শীর্ষ কোম্পানিগুলোর সাজানো নাটক।
বাজারের এই নৈরাজ্যকর ও জটিল পরিস্থিতি সামাল দিতে এনএসআই তাদের প্রতিবেদনে বেশ কিছু কঠোর ও সময়োপযোগী সুপারিশ তুলে ধরেছে। সংস্থাটি সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে একটি বিশেষ অডিট বা নিরীক্ষা পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শীর্ষ আমদানিকারকদের হাতে থাকা এলপিজি কার্গোগুলোর আগমনের তারিখ, খালাস করার সময়, গুদামজাতকরণের পরিমাণ এবং বাজারে প্রকৃতপক্ষে কবে সেগুলো ছাড়া হয়েছে—তার প্রতিটি স্তরের তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার সুপারিশ করা হয়েছে। অক্টোবর মাসের বর্ধিত প্রিমিয়াম কার্যকর হওয়ার পর ঠিক কত পরিমাণ পুরনো গ্যাস বাজারে ছাড়া হয়েছে, তার হিসাব বের করতে পারলেই কারসাজির প্রকৃত চিত্র উন্মোচিত হবে। গোয়েন্দা সংস্থাটি আরও পরামর্শ দিয়েছে যে, বাজার পুরোপুরি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত প্রতিদিনের আমদানি, মজুত এবং বাজারে সরবরাহের পরিমাণ কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে সরবরাহ আটকে রেখে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে, তবে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সরকারও এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পর নড়েচড়ে বসেছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি হাতে পাওয়ার কথা গণমাধ্যমের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন যে, সরকার পুরো বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে কাজ করছে এবং বাজার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত ৩০ সেপ্টেম্বর এক বিশেষ ভার্চুয়াল সভার মাধ্যমে দেশের সব জেলা প্রশাসককে (ডিসি) স্থানীয় এলপিজি বাজার কঠোরভাবে নজরদারি করার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। সরকারের এই দ্রুত পদক্ষেপ অন্তত এই বার্তা দিচ্ছে যে, মুষ্টিমেয় কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠানের হাতে দেশের কোটি কোটি ভোক্তাকে জিম্মি হতে দেওয়া হবে না।
এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছে। বৃহস্পতিবার দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সংগঠনটি তাদের আওতাভুক্ত সব সদস্য কোম্পানি, পরিবেশক, ডিলার এবং খুচরা বিক্রেতাদের কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছে যেন তারা কোনোভাবেই বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি না করেন। লোয়াব তাদের বিবৃতিতে পরিষ্কারভাবে স্বীকার করেছে যে, দেশে বর্তমানে এলপিজি আমদানির পরিমাণ অত্যন্ত সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে এবং সেপ্টেম্বর মাসে যে পরিমাণ গ্যাস আমদানি হয়েছে, তা দিয়ে দেশের স্বাভাবিক চাহিদা মেটানো পুরোপুরি সম্ভব। অর্থাৎ, বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির কোনো যৌক্তিক সুযোগ বা কারণ নেই। অ্যাসোসিয়েশন কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে যে, যদি কোনো অপারেটর বা ডিলার বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করে কিংবা অননুমোদিতভাবে গ্যাস মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করে, তবে তা দেশের প্রচলিত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নাম আসা অভিযুক্ত কোম্পানিগুলো স্বভাবতই তাদের বিরুদ্ধে ওঠা মজুতদারির অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করেছে। এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে সরাসরি অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ওমেরা পেট্রোলিয়ামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তানজীম চৌধুরী এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশের বাজারে এলপিজির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাকেই ওমেরা পেট্রোলিয়াম তাদের ব্যবসার সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারে চরম অস্থিতিশীলতার সময়েও তারা দেশের বাজারে গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রেখেছে বলে তিনি দাবি করেন। প্রতিবেদনে নাম থাকা বিদেশি বিনিয়োগপুষ্ট অন্য একটি শীর্ষ কোম্পানির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও এসব অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, এলপিজি কার্গোর গতিবিধি সর্বদাই নজরদারির মধ্যে থাকে এবং যেকোনো সময় তা ট্র্যাক করা সম্ভব, তাই মজুতদারির এই অভিযোগ বাস্তবতার সাথে একেবারেই মেলে না। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, তাদের কাছে যাবতীয় বৈধ নথিপত্র রয়েছে এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের যেকোনো প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে তারা সব সময় প্রস্তুত রয়েছেন।
কোম্পানিগুলোর এই জোরালো অস্বীকার এবং গোয়েন্দা সংস্থার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে সত্য কোনটি, তা হয়তো সরকারের নিবিড় তদন্তেই পুরোপুরি পরিষ্কার হয়ে উঠবে। তবে দিনশেষে সবচেয়ে বড় সত্য হলো, দেশের সাধারণ মানুষ এলপিজি কিনতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এবং তাদের কষ্টার্জিত অর্থ অসাধু সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যাচ্ছে। একটি সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থায় কখনোই গুটিকয়েক বড় প্রতিষ্ঠানের খেয়ালখুশির ওপর কোটি কোটি মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নির্ভর করতে পারে না। গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি যদি বিন্দুমাত্রও সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি দেশের এনার্জি সিকিউরিটি বা জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত। সরকারকে এখন আর কেবল সতর্কবার্তা বা মনিটরিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। দেশের আইন ও রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে এবং দোষীদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠান জনগণের পকেট কেটে রাতারাতি বিপুল মুনাফা লোটার দুঃসাহস দেখাতে না পারে। ভোক্তাদের অধিকার সুরক্ষা এবং বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই ধরনের ঘৃণ্য কারসাজির স্থায়ী অবসান ঘটানো সম্ভব।
তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার