• রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৫:১১ অপরাহ্ন

বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর নজর এখন কক্সবাজারে

Reporter Name / ২ Time View
Update : রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্রিটিশ বাণিজ্যিক সংস্থার তৎকালীন কর্মকর্তা অধিনায়ক হিরাম কক্সের হাত ধরে যে জনপদের পত্তন ঘটেছিল, দুইশত বছর পেরিয়ে আজকের বদলে যাওয়া বাস্তবতায় তা যেন এক নতুন রূপ ধারণ করেছে। সে সময়ে আরাকানি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন, বনভূমি আবাদ ও বর্মি আক্রমণ থেকে সীমান্ত সুরক্ষার জন্য যে অঞ্চলের গুরুত্ব নির্ধারিত হয়েছিল, বর্তমানে তার পরিধি কেবল স্থানীয় সীমারেখায় আবদ্ধ নেই। কক্সবাজার উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় এর ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্ব রাজনীতিতে এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সরকারপ্রধানের দূরপ্রাচ্যের দেশ সফরের পর এই জেলাটিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ওই সফরে একটি প্রভাবশালী দেশের পক্ষ থেকে তাদের একটি প্রদেশ থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য হয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি বড় যোগাযোগ পথ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই অঞ্চলটি একদিকে যেমন বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির ও দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের জন্য পরিচিত, অন্যদিকে তেমনি এটি বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর বাণিজ্য ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা কৌশলের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিকল্প পথ তৈরির জন্য বিশ্বের বড় রাষ্ট্রগুলো এই উপকূলের ওপর কড়া নজর রাখছে, যার সরাসরি প্রভাব মাতারবাড়ী ও পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর পড়ছে।

ভৌগোলিক ও কৌশলগত এই গুরুত্বের সমান্তরালে অঞ্চলটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও দিন দিন বেগবান হচ্ছে। সাধারণ পর্যটন নগরীর তকমা ছাড়িয়ে এই জেলাকে একটি বিশাল বাণিজ্যিক ও জ্বালানি কেন্দ্রে রূপান্তর করতে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিশেষ করে মহেশখালী ও মাতারবাড়ী এলাকায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র, তরলীকৃত গ্যাস কেন্দ্র এবং গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে, যার কিছু অংশ ইতিমধ্যে চালু হয়েছে। এছাড়া রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ সহজ করতে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি রেলপথ চালু করা হয়েছে এবং স্থানীয় বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণের কাজও চলমান রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখবে ঠিকই, কিন্তু বনভূমি উজাড়, পাহাড় কাটা এবং ভূমি দখলের মতো পরিবেশগত বিপর্যয় রোধ করা না গেলে এই উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না। তাই টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বিত প্রয়াস অত্যন্ত জরুরি।

অর্থনৈতিক এই বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে এক বিশাল মানবিক ও জাতীয় নিরাপত্তা সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে গত এক দশকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত নিপীড়নের জেরে সীমান্ত পার হয়ে আসা শরণার্থীর ঢল অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এখানে ১২ লাখের বেশি শরণার্থী আশ্রয় নিয়ে আছেন, যা এই অঞ্চলের জনসংখ্যা ও সম্পদের ওপর এক বিরাট চাপ তৈরি করেছে। এর আগে স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালেও প্রথম বড় আকারে প্রায় দুই লাখ মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। এই মানবিক সংকটের তীব্রতা দেখে জাতিসংঘের মহাসচিবও এই অঞ্চলের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সচল রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই দীর্ঘমেয়াদী সংকটের একটি স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে বর্তমান নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বিশ্বমঞ্চে বিভিন্ন সময় বহুমাত্রিক প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এমনকি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে রোহিঙ্গাদের জন্য বিশেষ প্রতিনিধি ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিয়োগের পর বর্তমানে তিনি দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন এবং আন্তর্জাতিকভাবে এক উচ্চ আসনে সমাদৃত হয়েছেন।

জাতীয় রাজনীতিতেও এই সীমান্তবর্তী জেলার প্রভাব ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক সরকার গঠনের পর দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এই জেলা থেকে উঠে এসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দায়িত্ব পেয়েছেন। শুধু বর্তমান সময়েই নয়, বরং ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলেও এই অঞ্চল থেকে একাধিক মন্ত্রী দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন, যারা অবিভক্ত বাংলার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলেছেন। তবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসরমাণ এই জেলাটি দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচার ও মাদক চোরাচালানের মতো আন্তঃসীমান্ত অপরাধের জন্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত। সীমান্তকেন্দ্রিক এসব অপরাধের জাল দেশের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়ছে, যা দমনে সরকার এখন জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। বিশেষ করে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া বিশাল জনগোষ্ঠীর উপস্থিতির কারণে মানব পাচারকারীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে অসহায় মানুষকে বিপদে ফেলছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে সুসংগঠিত অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে এই অপরাধী চক্রগুলোকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা হবে এবং এর আগে দেশের অন্যান্য অপরাধপ্রবণ অঞ্চলে যেভাবে সফল অভিযান চালানো হয়েছিল, এখানেও সেই একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে।

এর পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের বুকে অবস্থিত সেন্ট মার্টিন দ্বীপের মালিকানা ও ইজারা সংক্রান্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক বয়ান ও বিতর্কও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন সময়ে বিদেশী শক্তির সামরিক উপস্থিতি বা কৌশলগত চাপ সৃষ্টির যেসব দাবি সামনে এসেছে, তা যদিও পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে, তবে এই আলোচনাগুলো প্রমাণ করে যে বিশ্ব রাজনীতিতে এই অঞ্চলের প্রতিটি অংশ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই জেলাটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, সামষ্টিক অর্থনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির এক জটিল সমীকরণে রূপ নিয়েছে। এই সংবেদনশীল জনপদের আইনশৃঙ্খলারক্ষা, শরণার্থী প্রত্যাবাসন এবং অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন কেবল স্থানীয় স্বার্থের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও আগামী দিনগুলোতে এক বড় নিয়ামক হয়ে থাকবে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category