-রিন্টু আনোয়ার
ফায়ার না হওয়া পর্যন্ত গুলি-বোমা কেবলই একটা বস্তু। ফারারের পর তা বিধ্বংশী মারনাস্ত্র। তখন সে আলাদা করে কাউকে চেনে না। যেখানে পড়ে সেখানে নারী-শিশু, বৃদ্ধ, ধার্মিক-অধার্মিক, দ্বীন-বেদ্বীন চেনে না। ম্যাসাকারে সব এককাকার করে দেয়। আর বিশ্বায়নের অনিবার্য জেরে মারনাস্ত্র বিশ্বের যে গোলার্ধেই পড়ুক তার জের, তাপ-উত্তাপ তথা ধ্বংশ লীলায় আক্রান্ত হতে হয় গোটা বিশ্বকে। ইরাক যুদ্ধের তাপে এ গোলার্ধেও তেল ও খাদ্যের দাম বাড়ছে। শিকারে পড়েছে বাংলাদেশও।
উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বুধবার এ তদন্ত শুরুর ঘোষণা দেন। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ নম্বর ধারা অনুযায়ী এ তদন্ত করা হবে। বাংলাদেশসহ আরও যে ১৫টি দেশের বিরুদ্ধে এ তদন্ত করা হবে, সেই দেশগুলো হলো চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, মেক্সিকো, জাপান ও ভারত।
যুদ্ধতাড়িত এ সময়ে এসে উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে অন্য ১৬ দেশের তালিকার সঙ্গে যোগ হয়ে গেছে বাংলাদেশের নামও। অথচ বাংলাদেশ এমন বিষয়ে সাবজেক্ট-অবজেক্ট কোনোটাই নয়। দেশটির নাম আসার কোনো যৌক্তিকতা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি পড়ে আসমান ভেংঙে পড়ার অবস্থা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের। বিষয়টি চরম অস্বস্তির। বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদনে মেধাস্বত্বের চর্চা এখনো সীমিত। মার্কিন ব্র্যান্ডের পণ্যের বাজারও খুবই ছোট। পণ্য রপ্তানিতে প্রণোদনাও খুবই অল্প। কৃষিতে প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে কিছু প্রশ্ন আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র তো নিজেই কৃষিতে প্রণোদনা দেয়। বাংলাদেশে দেয়া হয় শুধু সারে। যুদ্ধের উত্তাপের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এমন কাজ কেন করলো অনেকের মাথায় আসছে না। এটি এ সময়ে ধারনারও বাইরে। যুক্তরাষ্ট্র কি নিজেদের স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার অভিপ্রায় থেকে এমন তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে, না বিশ্বে নতুন আরেকটি কাউর বাধানোর জন্য করেছে-ভেবে কুলকিনারা করা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা বাজার বিশ্বের সবচেয়ে বড়। সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানির বড় অংশই তৈরি পোশাক। তদন্তে যে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে, তা হলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতি, পদক্ষেপ বা উৎপাদনকাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক কি না এবং সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না।
এমনিতেই চলমান ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের মধ্য দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি বড় সংকটে পড়েছে। এর আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে লাগা ধাক্কা এখনও সইতে হচ্ছে। মাত্রাগতভাবে এবারের ধাক্কা আরো তেজি। জ্বালানি প্রশ্নে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকার জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ চালু করেছে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসনির্ভর হওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানির ওপর দেশের নির্ভরতা বেড়েছে। আমদানিকৃত গ্যাসের উপর অত্যধিক নির্ভরতা দেশের জাতীয় বাজেটের উপর চাপ সৃষ্টি করেছে, যার ফলে জ্বালানি সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাতের ঝুঁকিতে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীর কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১শ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়া এবং সরবরাহ পথ ব্যাহত হওয়ার কারণে বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো এশিয়াজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা তেল ও গ্যাসের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল এই অঞ্চলের বহু দেশ অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে জরুরি ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে।
যুদ্ধ শুরুর পর অন্তত ৮৫টি দেশে তেলের দাম বেড়েছে। এ তালিকায় বাংলাদেশ না থাকলেও এরইমধ্যে যে ছাপ পড়েছে তা আগামী কয়েকদিন চললে অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বলা যায় না। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে আফগানিস্তানে (৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ)। এরপর পাকিস্তানে ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। এর বাইরে, মিয়ানমারে পেট্রোলের দাম বেড়েছে ১ দশমিক ৪২ শতাংশ। এমনকি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেল উৎপাদক কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতেও তেলের দাম বেড়েছে। দেশ দুটিতে পেট্রোলের দাম বেড়েছে যথাক্রমে ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ। প্রতিবেশি ভারতের পুনে শহরে সাময়িকভাবে গ্যাসচালিত দাহকার্য বন্ধ রাখা হয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য কর্তৃপক্ষ মানুষকে কাঠ বা বিদ্যুৎ ব্যবহার করার অনুরোধ জানিয়েছে। নিয়মিত চালকদের চাহিদা কমাতে পাকিস্তান পেট্রোলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। তবে, ট্রাক ও বাস চলাচল সচল রাখতে ডিজেলের দাম তুলনামূলকভাবে কম রেখেছে।
যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হওয়ার পর থেকেই তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলে সতর্কতা বেড়েছে, অনেক জাহাজ বিকল্প পথ খুঁজছে এবং পরিবহন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো—বিশেষ করে সৌদি আরবের তেল শোধনাগার এবং কাতারের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি স্থাপনাগুলো—ঘিরেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশ বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে ভাবছে। এ প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকেও অস্থায়ী ছাড় দিলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য সহায়ক হবে বলে ভাবছে সরকার। ওয়াশিংটনের সাথে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন কী সিদ্ধান্ত দেয় সেই অপেক্ষায় বাংলাদেশ। এরকম আশাবাদ বা অপেক্ষার কারণ সম্প্রতি সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তাই একই ধরনের সুযোগ পাওয়ার আশায় অনুরোধ রেখেছে বাংলাদেশও।
যুক্তরাষ্ট্র এ আশা মেটালেই কি ল্যাঠা চুকে যাবে বা নির্ভার নিশ্চিত হয়ে যাবে বাংলাদেশ ? যুদ্ধ আরো প্রলম্বিত হলে কী দশা হবে? এ প্রশ্নের সমান্তরাল প্রশ্ন-এ পর্যন্ত যা হয়েছে, যে সর্বনাশ হয়ে গেছে তা-ই বা কিভাবে সামলাবে বাংলাদেশ। সেখানে একটু আশাবাদ আছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোলাল্ড ট্রাম্পের কথায়। তিনি বলেছেন, ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর মতো ‘কার্যত আর কিছুই বাকি নেই’। তাই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ‘খুব শিগগির’ শেষ হতে পারে। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা জানিয়েছেন। আবার যে তিনি আরেকটা বলবেন না, কে জানে? যুদ্ধ না করেও আরো কতো কিছু করা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা সুপার পাওয়ারগুলোর আরো কতো কিছুই করার আছে। এ ছাড়া, আগ্রাসন বা যুদ্ধ মানেই শুধু সীমান্তে গোলাগুলি, ক্ষেপণাস্ত্র বা কূটনৈতিক উত্তেজনা নয়। ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাতও সেই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। যুদ্ধ না বলে অনেকেই এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট হিসেবে দেখছেন। প্রায় ৫০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের মধ্যে একটি বিশ্বাস প্রচলিত আছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে শুধু রাজনীতি বা ভূরাজনীতির ঘটনা হিসেবে দেখে না; তাদের অনেকেই মনে করে, এসব ঘটনার মধ্যেই বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তব হয়ে উঠছে। এ বিশ্বাসে লাখ লাখ মানুষকে বড় করা হয়েছে। এ ব্যাখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাইবেলের ‘ইজেকিয়েল’ গ্রন্থের ৩৮ নম্বর অধ্যায়। সেখানে বলা হয়েছে, কিছু দেশ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জোট বাঁধবে। অনেকের মতে, সেখানে উল্লেখ করা পারস্য বলতে আজকের ইরানকে বোঝানো হয়েছে।
বয়ানে যা-ই থাক বাস্তবে এ সর্বনাশের প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। কারণ ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র নয়; এটি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, উপসাগরীয় ভূরাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় শক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের একটি কৌশলগত কেন্দ্র। কেবল তেল বা জ্বালানী নয়, একই সঙ্গে শেয়ারবাজারে অস্থিরতা, বন্ডের আয়ের ওঠানামা এবং জ্বালানি পরিবহনে নিরাপত্তা ঝুঁকি—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি নতুন চাপের মুখে পড়েছে। এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারস্য উপসাগরের একটি সরু কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ—হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালির মধ্য দিয়ে যায়। ইরানসংলগ্ন এই কৌশলগত প্রণালিতে সামান্য বিঘ্নও বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশ এরইমধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি বিলও বাড়বে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে। ডলারের চাহিদা বাড়বে এবং টাকার মান দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধের গোলা যদি তেহরানে পড়ে, তার অর্থনৈতিক প্রতিধ্বনি ঢাকায় শোনা যেতে পারে ডলারের বাজারে, বিদ্যুতের খরচে কিংবা বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত রেমিট্যান্স। দেশের বিপুল সংখ্যক শ্রমিক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করেন। বাংলাদেশের জন্য তৃতীয় বড় ঝুঁকি রপ্তানি খাতে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প, যা মূলত পশ্চিমা বাজারের ওপর নির্ভরশীল। সেখানেও এখন ফ্যাকড়া বাধছে। এ ছাড়া বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্নও বাংলাদেশের জন্য আরো বড় ঝুঁকি। তাই অবস্থা দৃষ্টে বলতে হয়-“রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়” অর্থাৎ, বড় বড় রাঘববোয়ালদের বিবাদে নিরীহ সাধারণ মানুষই বেশি ভোগান্তির শিকার হয়।
……..
লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট