• রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ০২:৩২ অপরাহ্ন

ভঙ্গুর আর্থিক খাত ও প্রবৃদ্ধি অর্জনের চ্যালেঞ্জ

Reporter Name / ৪ Time View
Update : রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল ব্যয় এবং সাড়ে ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির এক উচ্চাভিলাষী বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দেশকে একটি বিনিয়োগনির্ভর অর্থনৈতিক মডেলে রূপান্তরের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনাও প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে সরকারের এই কাঙ্ক্ষিত ও গৌরবময় অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পথে মূল অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের চরম সংকটাপন্ন ও ভঙ্গুর ব্যাংকিং ব্যবস্থা। বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরশীল। দেশের মোট জিডিপির প্রায় অর্ধেক বা ৫০ শতাংশই আসে ব্যাংকিং খাতের সম্পদ থেকে, যার ৮৫ শতাংশই আবার বিভিন্ন মেয়াদে দেওয়া ঋণ ও বিনিয়োগ। এমনকি খোদ সরকারও নিজের বাজেট ঘাটতি মেটাতে এই খাতের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। এবারের বাজেটে যে বিশাল ঘাটতি ধরা হয়েছে, তার ৪৬ শতাংশ অর্থই আসবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে। ফলে ব্যাংক খাত সংকটে থাকলে দেশের কোনো অর্থনৈতিক লক্ষ্যই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

মূলধন সংকট ও ইতিহাসের সর্বনিম্ন ঋণপ্রবাহ

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী নিজেই দেশের আর্থিক খাতের একটি অন্ধকার ও করুণ চিত্র উন্মোচন করেছেন। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরিত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। বর্তমানে মোট জিডিপিতে বেসরকারি ঋণের অনুপাত মাত্র ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ, যা গত এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থান। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বেসরকারি বিনিয়োগে এক ধরণের চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে।

বৈশ্বিক উদাহরণ ও ‘হারানো দশক’-এর শঙ্কা

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং খাতের এই গভীর সংকট পুরো রাষ্ট্রকে দেউলিয়া করে দিতে পারে। ১৯৮০-এর দশকের শেষভাগে জাপানের ব্যাংকগুলো আবাসন ও শেয়ার বাজারে অতিরিক্ত ঋণ দেওয়ার পর বাজার ধসে পড়লে দেশটিতে এক যুগেরও বেশি সময় স্থায়ী অর্থনৈতিক স্থবিরতা দেখা দেয়, যা ইতিহাসে ‘লস্ট ডিকেড’ বা হারানো দশক নামে পরিচিত।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দুই খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ লুক লেভেন ও ফাবিয়ান ভ্যালেন্সিয়া বিশ্বের ১৫১টি ব্যাংকিং সংকট পর্যালোচনা করে দেখিয়েছেন, কোনো দেশে মোট ঋণের ২০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে গেলে এবং ব্যাংক খাত বাঁচাতে সরকারের প্রণোদনা ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে তা পদ্ধতিগত ব্যাংকিং সংকট (Systemic Banking Crisis) হিসেবে গণ্য হয়। এই সংকটের কারণে একটি দেশের জিডিপি গড়ে প্রতি বছর ৭ শতাংশ হারে উৎপাদন ক্ষমতা হারায় এবং সংকট সামাল দিতে সরকারকে গড়ে জিডিপির ৮.৭ শতাংশ অর্থ স্রেফ ব্যাংকগুলোর পেছনে ব্যয় করতে হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি হিসাবেই খেলাপি ঋণ ৩৫ শতাংশ পার হওয়ায় গবেষকদের দেওয়া মারাত্মক সংকটের প্রতিটি সংজ্ঞাই এখন দৃশ্যমান।

টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক বাঁচানোর বিপজ্জনক নীতি

বিগত রাজনৈতিক আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সংকটে পড়া দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে দেদারসে টাকা ছাপিয়ে তারল্য সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মোট ১২টি দুর্বল ব্যাংককে এ পর্যন্ত ৬৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ধার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিগত গভর্নরের আমলে ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা এবং সদ্য বিদায়ী গভর্নরের আমলে ৫১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। তিন মাসের জন্য দেওয়া এই বিশাল অঙ্কের অর্থ এক বছর পার হলেও ব্যাংকগুলো ফেরত দিতে পারেনি। এছাড়া পাঁচটি ইসলামি ধারার ব্যাংককে একীভূত করতে সরকারের আরও ২০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। চলতি অর্থবছরেই ব্যাংকগুলোর মূলধন সংকট কাটাতে জাতীয় বাজেট থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ অপচয় করতে হচ্ছে, যা জনগণের করের টাকার এক চরম অপব্যবহার।

ইসলামী ব্যাংকের রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও নতুন সংকট

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংক খাতের সংস্কারের কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ’ একাই পুরো ব্যাংকিং খাতের ৮.৭ শতাংশ সম্পদ এবং জিডিপির ৪.৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বিগত সরকারের সময় রাষ্ট্রের সরাসরি সহায়তায় এস আলম গ্রুপ এই ব্যাংকটির মালিকানা জোরপূর্বক দখল করে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করে, যার ফলে ব্যাংকটি চরম তারল্য সংকটে পড়ে।

সম্প্রতি নির্বাচনের পর ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন’ পাস করার সময় পুরোনো মালিকদের কাছে ব্যাংক ফেরত দেওয়ার একটি বিতর্কিত ধারা যুক্ত করায় নতুন করে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এর ওপর শীর্ষ পদে আকস্মিক পদত্যাগ ও নতুন নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাংকটি নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কর্তৃক নির্বাচনের সময় এই ব্যাংকের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ তোলার পর গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র আস্থা সংকট তৈরি হয়েছে। অনেকেই ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে ইসলামী ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নতুন করে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা জরুরি তারল্য সহায়তা চেয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর আশ্বস্ত করেছেন যে গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ থাকবে, তবে বিশ্লেষকদের মতে, টাকা ধার দিয়ে এই পদ্ধতিগত রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

সরকারি ব্যাংকের চরম দুর্দশা ও বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট

বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের বিশেষ বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাষ্ট্রমালিকানাধীন সরকারি ব্যাংকগুলোই আর্থিক খাতের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। এই ব্যাংকগুলো দেশের মোট ব্যাংকিং সম্পদের প্রায় ২৭ শতাংশ এবং জিডিপির ১২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। অথচ বর্তমানে সরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৪৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। জনতা ব্যাংককে সরকার কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখলেও একসময়ের নামকরা বেসিক ব্যাংক আর কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বেসরকারি খাতের আরও ১১টি ব্যাংক চরম দুর্দশার মধ্যে অতিবাহিত করছে। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, এই শীর্ষ ব্যাংকগুলোকে দ্রুত টেনে তুলতে না পারলে পুরো আর্থিক খাত ধসে পড়বে।

সংস্কার কমিশনের অনুপস্থিতি ও করণীয়

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকিং সংকট শনাক্ত করতে এবং ব্যবস্থা নিতে যত দেরি হবে, সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ তত বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, ব্যাংক খাতকে বাঁচাতে হলে এটিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করতে হবে এবং অবিলম্বে দক্ষ, যোগ্য ও নির্মোহ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ‘ব্যাংক সংস্কার কমিশন’ গঠন করতে হবে।

উল্লেখ্য, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন, বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধি এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বিলুপ্ত করার স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকলেও নতুন বাজেটে তার কোনো প্রতিফলন বা সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি। বাংলাদেশে সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে অর্থনীতিবিদ ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বে ব্যাংক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এরপর বিগত সরকারের সময়ে দুইবার কমিশন গঠনের ঘোষণা দেওয়া হলেও প্রভাবশালী ঋণখেলাপি ও আমলাদের বাধায় তা আর আলোর মুখ দেখেনি। বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ অনুযায়ী, ব্যাংক পুনর্গঠন কাঠামো তৈরি, আমানত সুরক্ষা জোরদার করা, আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার প্রয়োগ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত না করলে অর্থমন্ত্রীর এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

তথ্যসূত্র: প্রথম আলো


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category