• মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১১:১৯ অপরাহ্ন
Headline
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ, এবার রামিসা হত্যা মামলার চূড়ান্ত যুক্তিতর্কে পালা সারাদেশে মৃদু তাপপ্রবাহ, কিছু অঞ্চলে বৃষ্টির পূর্বাভাস বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এক নতুন মাইলফলকে: স্পিকার এলপিজি ও অটোগ্যাসের দাম কমলো বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত তোফায়েল আহমেদ রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে নরওয়ের জোরালো ভূমিকা চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বাড়াতে ঢাকা ও বার্নের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগ ২৩ ঘরোয়া ও ৪৭ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট নিয়ে বাফুফের মেগা বর্ষপঞ্জি প্রকাশ পরীক্ষায় ভালো করার সিক্রেট: একজন সেরা ছাত্রের পরামর্শ গোহত্যা করলে মুসলিমদের চরম পরিণতি ভোগ করার হুমকি উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর

ভারতে ‘থ্রিডি’ নীতি: সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা ও মানবিক সংকট

Reporter Name / ৭ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশ লাগোয়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সীমান্তজুড়ে এখন এক অদ্ভুত অস্থিরতা ও পৈশাচিক আতঙ্ক বিরাজ করছে। কোনো যুদ্ধ বাঁধেনি, কোনো মহামারীও আসেনি, তবুও হাজার হাজার মানুষ তল্পিতল্পা গুটিয়ে, কোলের সন্তানকে নিয়ে হন্যে হয়ে বাংলাদেশের দিকে ছুটছেন। এই আকস্মিক ও গণ-পলায়নের পেছনে রয়েছে ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির এক চরম বিতর্কিত ও আগ্রাসী রাজনৈতিক চাল, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘থ্রিডি’ নীতি। খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে, আন্তর্জাতিক সব আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, কোনো প্রকার আইনি বিচার ছাড়াই ভারত থেকে বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষকে ঠেলে দেওয়ার এটি এক সুপরিকল্পিত ও একতরফা ছক। তবে বাংলাদেশও এই আগ্রাসনের মুখে হাত গুটিয়ে বসে নেই। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে এই পুশ-ইন প্রতিরোধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সম্প্রতি এক নজিরবিহীন ও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে হটিয়ে দিয়ে সেখানে ক্ষমতা দখল করেছে বিজেপি। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা শুভেন্দু অধিকারী। নির্বাচনের আগে বিজেপির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ট্রাম্পকার্ড ছিল ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ ইস্যু। তারা ভোটারদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, লাখ লাখ বাংলাদেশী পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতি, চাকরি আর সংস্কৃতিকে গ্রাস করছে। ক্ষমতায় এসেই নতুন মুখ্যমন্ত্রী তার সেই উগ্র নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে মাঠে নেমে পড়েছেন। আর এই চরম বৈষম্যমূলক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই জন্ম নিয়েছে বহুল বিতর্কিত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী থ্রিডি নীতি।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, যারা নাগরিকত্ব সংশোধন আইন বা সিএএ (CAA)-র আওতায় পড়বেন না, তাদের সবাইকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য করা হবে। আর তাদের রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিতে যে ‘থ্রিডি’ মডেল ব্যবহার করা হচ্ছে, তার তিনটি সুনির্দিষ্ট ধাপ রয়েছে। এর প্রথম ধাপ হলো ‘ডিটেক্ট’ বা চিহ্নিত করা। রাজ্য পুলিশ ও গোয়েন্দারা বিভিন্ন এলাকায় চিরুনি অভিযান চালিয়ে খুঁজে বের করবে কারা তথাকথিত অবৈধ অধিবাসী। বিশেষ করে যারা বিভিন্ন গ্যারেজে, রাজমিস্ত্রির কাজে বা কলকারখানায় দিনমজুর হিসেবে খাটছেন, তাদের টার্গেট করা হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপটি হলো ‘ডিলিট’, যা সবচেয়ে বিপজ্জনক। চিহ্নিত করার পর ভারতের রেশন কার্ড, ভোটার আইডি বা যেকোনো সরকারি ডাটাবেস থেকে তাদের নাম ও তথ্য সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হবে। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে ভারতে তাদের অস্তিত্বের সব প্রমাণ এক ঝটকায় বিলীন করে দেওয়া হবে। শেষ ধাপ হলো ‘ডিপোর্ট’। নাম ডিলিট করেই কাজ শেষ নয়, তাদের ধরে সরাসরি সীমান্তে এনে বাংলাদেশে পুশ-ইন বা জোরপূর্বক পুশব্যাক করা হবে।

এই থ্রিডি মডেলের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দিকটি হলো—‘নো কোর্ট, নো জেল’ নীতি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং খোদ ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, কোনো দেশে অবৈধ বিদেশী ধরা পড়লে তাকে আদালতে তোলা বাধ্যতামূলক। সেখানে আইনি প্রক্রিয়া চলবে, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের পক্ষে আইনজীবী দেওয়ার সুযোগ পাবেন এবং সাজা খাটার পর দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে তাকে ফেরত পাঠানো হবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বিজেপি সরকার এই সমস্ত আইনি প্রক্রিয়াকে ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলেছে। মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, এদের আদালতে পাঠানোর বা কোনো আইনি সুযোগ দেওয়ার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই। জেলে ঢুকিয়ে রাজ্যের টাকা খরচ করে তাদের খাওয়ানোর কোনো মানে হয় না।

আদালতের এখতিয়ারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা রাজ্যজুড়ে তড়িঘড়ি করে ১১টি হোল্ডিং সেন্টার বা ডিটেনশন ক্যাম্প বানিয়ে ফেলেছে। বারুইপুর, বসিরহাট, বনগাঁ, মালদা এবং মুর্শিদাবাদের মতো সীমান্ত এলাকাগুলোতে এই ক্যাম্পগুলো এখন একেকটি আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। পুলিশ সন্দেহভাজনদের ধরে এনে সোজা এই ক্যাম্পে পুরছে। কোনো বিচার বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তাদের সোজা সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, যাতে বিএসএফ রাতের অন্ধকারে সুযোগ বুঝে তাদের সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পুশ-ইন করিয়ে দিতে পারে।

এই নীতি ঘোষণা করার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে কাজ করা প্রান্তিক মানুষ, বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে যমদূতের মতো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ কাগজপত্র থাকার পরেও স্রেফ ভাষা, আঞ্চলিক টান বা পোশাকের কারণে তীব্র হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে অনেককে। যারা একটু ভালো উপার্জনের আশায় বছরের পর বছর ধরে হাওড়া বা কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় রাজমিস্ত্রি বা মেকানিকের কাজ করে আসছিলেন, তারা এখন পুরোপুরি দিশেহারা। আতঙ্কের চোটে স্থানীয় বাড়ির মালিক বা গ্যারেজ মালিকরা আইনি ঝামেলা এড়াতে তাদের আর কাজে রাখছেন না এবং ঘর থেকে বের করে দিচ্ছেন। মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্ত চেকপোস্টে তাকালে দেখা যাচ্ছে আতঙ্কিত মানুষের উপচে পড়া ভিড়।

পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশের সাথে প্রায় ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত শেয়ার করে, যার মধ্যে এখনো প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার এলাকা উন্মুক্ত বা কাঁটাতারহীন। ভারত সরকারের দাবি, গত কয়েক দশকে দেড় কোটির বেশি মানুষ অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছে, যা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। তাই ভারতের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’ এলাকার ১২১ হেক্টরের বেশি জমিও এখন দ্রুত কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। মাত্র ৪৫ দিনের ডেডলাইন বা সময়সীমা দেওয়া হয়েছে এই কাজ শেষ করার জন্য।

তবে মূল সমস্যাটা অন্য জায়গায়। এই থ্রিডি মডেলের মাধ্যমে ভারত একতরফাভাবে বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে দেওয়ার যে নীতি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, তা আন্তর্জাতিক আইনে সম্পূর্ণ বেআইনি। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক নাগরিকত্বের প্রমাণ বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ছাড়া এই মানুষদের গ্রহণ করতে বিন্দুমাত্র বাধ্য নয়। ফলে বিএসএফ যখন সীমান্তে পুশ-ইন করার চেষ্টা করছে, তখন এপার থেকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সর্বোচ্চ প্রতিরোধ তৈরি করছে। সীমান্তে নিরাপত্তা ও টহল বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর খলিলুর রহমান ইতিমধ্যেই অত্যন্ত কড়া ভাষায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, একতরফা পুশ-ইনের কোনো ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এবং সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোরতম ব্যবস্থা নেবে।

ফলাফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে; দুই দেশের ভূ-রাজনৈতিক জেদ এবং ভারতের একতরফা আগ্রাসনের মাঝে পড়ে হাজার হাজার নিরীহ, দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ আজ সীমান্ত রেখায় নো-ম্যানস ল্যান্ডে এক অনিশ্চিত ও চরম অমানবিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে ছটফট করছেন। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির এক চরম একতরফা ও বিতর্কিত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ‘থ্রিডি’ নীতি আজ হাজারো মানুষের জীবনকে এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ভারতের এই আইনবহির্ভূত পুশ-ইন নীতি কি শেষ পর্যন্ত দুই প্রতিবেশী দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় কোনো ফাটল ধরাবে, নাকি আন্তর্জাতিক মহল এই ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দ্রুত মুখ খুলবে—তা-ই এখন দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category