• রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬, ০৭:১৬ অপরাহ্ন

ভারতে নিবন্ধিত ১২৩ রোহিঙ্গা এখনো বাংলাদেশে, ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেই

Reporter Name / ৬ Time View
Update : রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সুদীর্ঘ ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফের পুশইন (জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ) চেষ্টার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত থেকে সুপরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশে মানুষ ঠেলে দেওয়ার এই অনৈতিক তৎপরতার কারণে দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি-র সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত শনিবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্টে বিএসএফের অন্তত ৪৩টি পুশইনের চেষ্টা অত্যন্ত সফলভাবে নস্যাৎ করে দিয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা। তবে বিজিবির কঠোর নজরদারির মধ্যেও গত এক বছরে ভারতের অভ্যন্তরে চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষকে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে বাধ্য করা হয়েছে।

বিজিবি সদর দপ্তরের গোপন ও আনুষ্ঠানিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ৭ই মে থেকে ২০২৬ সালের ২৬শে জানুয়ারি পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট সময়কালের মধ্যেই ভারত থেকে মোট ২ হাজার ৩৪৪ জন মানুষকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইন করা হয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিএসএফের পুশইনের শিকার হওয়া এই বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা নাগরিক ছাড়াও অন্তত ১২৬ জন ভারতের মূল নাগরিক বা ভারতীয় মুসলিম অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এই পুশইনের তালিকায় রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম রাজ্যের বৈধ মুসলিম নাগরিকদেরও অবৈধভাবে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে রাতের আঁধারে সীমান্ত পার করে দেওয়ার এক বিপজ্জনক প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশে আটকে পড়া ভারতীয় নিবন্ধিত রোহিঙ্গা

বিএসএফের এই বলপ্রয়োগ নীতি বা পুশইনের সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে ভারতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন বা ইউএনএইচসিআর (UNHCR) এর কাছে আইনিভাবে নিবন্ধিত একদল রোহিঙ্গা শরণার্থী। ২০২৫ সালের মে মাস থেকে শুরু হওয়া পরবর্তী তিন মাসের এক সাঁড়াশি অভিযানে ভারত থেকে অন্তত ১২৩ জন ইউএনএইচসিআর-নিবন্ধিত রোহিঙ্গাকে জোরপূর্বক পুশইন করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে এই ভাগ্যাহত শরণার্থীরা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার অত্যন্ত জনাকীর্ণ ও ঘিঞ্জি আশ্রয় শিবিরগুলোতে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন।

এই পুশইনের ঘটনার পরপরই বাংলাদেশের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয় থেকে ২০২৫ সালের ১৪ই জুলাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়ে পুরো বিষয়টি বিশদভাবে জানানো হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও ভারতে নিবন্ধিত এই শরণার্থীদের পুনরায় ভারতে ফেরত পাঠানো বা যথাযথ আইনি উপায়ে প্রত্যাবাসন করার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। আরআরআরসি প্রধান মোহাম্মদ মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, ভারতে নিবন্ধিত এই ১২৩ জন রোহিঙ্গা এখনো উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতেই অবস্থান করছেন।

আরআরআরসি-র তৎকালীন চিঠির নথিতে আরও দেখা যায়, একই সময়ে বিএসএফ কেবল ভারতে নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদেরই ঠেলে দেয়নি, বরং আন্তর্জাতিক নিয়ম অমান্য করে আরও ৪৪ জন অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা এবং বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআর-এর অধীনে নিবন্ধিত হয়ে ভারতে বেড়াতে বা অন্য কাজে যাওয়া ৮০ জন রোহিঙ্গাকেও জোরপূর্বক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে। বর্তমানে তাদের সবাইকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের জন্য নির্ধারিত কক্সবাজারের বিশেষ ক্যাম্পে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সচিব মোঃ সাইদুর রহমান খান জানিয়েছেন, তিনি চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এই পদে নতুন যোগদান করার কারণে পূর্ববর্তী বছরের সেই সংবেদনশীল চিঠির বিষয়ে বিস্তারিত এখনো অবগত নন।

ভারতীয় মুসলিমদের পুশইন ও সীমান্ত সংকট

বিএসএফের পুশইন নীতি যে কেবল রোহিঙ্গাদের ওপর সীমাবদ্ধ নেই, তার প্রমাণ মেলে বিজিবির পরিসংখ্যানে। গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের মধ্যে অন্তত ১২৬ জন ভারতের নিজস্ব নাগরিককে বাংলাদেশে জোরপূর্বক পুশইন করা হয়েছিল। অনুপ্রবেশের পরপরই বিজিবি তাদের আটক করে এবং পরবর্তীতে কঠোর কূটনৈতিক ও সীমান্ত আলোচনার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে বিএসএফের কাছেই তাদের পুনরায় হস্তান্তর বা পুশব্যাক করা হয়।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ভারতের প্রতিবেশী রাজ্য আসামের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সুপরিকল্পিতভাবে ডজন ডজন ভারতীয় মুসলিমকে ‘নথিপত্রহীন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পুশইন করে। বিজিবি তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পুশব্যাক করলে সেই ভারতীয় নাগরিকরা দুই দেশের মধ্যবর্তী ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’ বা শূন্যরেখায় দিনের পর দিন চরম খাদ্য ও নিরাপত্তাহীনতায় অবরুদ্ধ অবস্থায় কাটান। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিজস্ব নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে নিলেও, কেন তাদের এভাবে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছিল, তার কোনো আনুষ্ঠানিক বা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে ঢাকাকে দেওয়া হয়নি।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ও কট্টরপন্থী আগ্রাসন

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি সরকারের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুই দেশের সীমান্তে এই ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত ও উসকানিমূলক পুশইনের ঘটনা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই কোনো প্রকার আন্তর্জাতিক আইন বা দ্বিপাক্ষিক আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করেই তথাকথিত ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী’ চিহ্নিত করে তাদের বাংলাদেশে পুশইনের একতরফা নির্দেশ জারি করেন। একই সাথে তিনি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় সন্দেহভাজন মানুষদের আটকে রাখার জন্য বিশেষ ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা ডিটেনশন ক্যাম্প নির্মাণেরও আদেশ দিয়েছেন।

বিজেপি গত এক দশক ধরেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এই পুশইন কৌশল ব্যবহার করে আসছে। শুভেন্দু অধিকারী সম্প্রতি দাবি করেছেন যে, তাঁর সরকার গত এক মাসে প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি নাগরিককে সফলভাবে পুশইন বা ডিপোর্ট করেছে। তবে বিজিবির পক্ষ থেকে ভারতীয় মুখ্যমন্ত্রীর এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন এবং সস্তা রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ভারতীয় পুলিশ ও সীমান্ত রক্ষী বাহিনী কোনো বৈধ যাচাই-বাছাই ছাড়াই স্রেফ ধর্মীয় পরিচয় ও পোশাক দেখে সাধারণ মুসলিমদের ধরে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠাচ্ছে এবং সুযোগ বুঝে বাংলাদেশে পুশইন করার চেষ্টা করছে, যা পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।

আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের মতামত

ভারতে আইনিভাবে নিবন্ধিত ও স্বীকৃত শরণার্থীদের এভাবে জোরপূর্বক অন্য একটি রাষ্ট্রে ঠেলে দেওয়ার এই ঘটনাকে ‘মানবাধিকারের বিরুদ্ধে চরম অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান। তিনি বলেন, “বিএসএফের এই পুশইন অভিযান সম্পূর্ণ বর্ণবাদী এবং এটি সুনির্দিষ্টভাবে একটি বিশেষ ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার নিবন্ধিত শরণার্থীদের এভাবে জোরপূর্বক অন্য দেশে পাঠিয়ে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও জেনেভা কনভেনশনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।”

বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক

সীমান্তের এই চরম উত্তেজনাপূর্ণ ও মানবিক সংকটের মধ্যেই গত ১১ই জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যকার ৫৭তম মহাপরিচালক (DG) পর্যায়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত সম্মেলন শেষ হয়েছে। বৈঠকে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পুশইন নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বিএসএফের মহাপরিচালককে যেকোনো মূল্যে অবৈধ পুশইন সম্পূর্ণ বন্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যদি ভারতের কাছে কোনো ব্যক্তিকে বাংলাদেশি বলে সন্দেহ হয়, তবে তাকে জোর করে পুশইন না করে দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক প্রোটোকল, আইনি প্রক্রিয়া এবং জাতীয়তা যাচাই-বাছাইয়ের প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম অনুসরণ করে সম্মানজনকভাবে প্রত্যাবাসন করতে হবে।

বিজিবির এই কঠোর অবস্থানের জবাবে বিএসএফের মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার জানান, ভারতের কাছে সন্দেহভাজন হিসেবে থাকা ব্যক্তিদের জাতীয়তা যাচাইয়ের যে সমস্ত আবেদন বাংলাদেশ সরকারের কাছে ঝুলে রয়েছে, সেগুলো যেন দ্রুত সম্পন্ন করা হয় এবং তাদের দ্রুত ভারতে ফেরত নেওয়ার আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। বৈঠক শেষে প্রকাশিত দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে সীমান্ত সুরক্ষায় পারস্পরিক সমঝোতা বজায় রাখার কথা বলা হলেও, ভারতের মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক এজেন্ডার কারণে প্রাগপুর ও বিলগাথুয়াসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর জল ও স্থল সীমান্তে বিজিবির পক্ষ থেকে বর্তমানে সর্বোচ্চ সতর্কতা এবং সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র: নিউ এজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category