একজন বড় ব্যবসায়ী। বিশাল ব্যবসা। শত কোটি টাকার মালিক।
শানশওকতে চোখ ধাঁধিয়ে যায়।
বিস্ময়ের ব্যাপার হলো—তিনি এক দরিদ্র বৃদ্ধকে খুব শ্রদ্ধা করেন। তাঁকে গ্রামে বাড়ি করে দিয়েছেন। বুড়ো বয়সে তিনি যাতে আয়েশে জীবন কাটাতে পারেন, তার সব বন্দোবস্ত করেছেন। তাঁর ছেলেদের নিজের কোম্পানিতে চাকরি দিয়েছেন। তাছাড়া তাঁর শহরের আলিশান বাড়িতে বৃদ্ধ মানুষটির জন্য আলাদা রুম আছে। তিনি শহরে এলে সেখানেই থাকেন।
ব্যবসায়ী ভদ্রলোক নতুন কোনো ব্যবসা শুরু করলেই বুড়ো মানুষটিকে দেখা যায়। গাড়ি পাঠিয়ে তাঁকে গ্রাম থেকে আনা হয়। তাঁর মুনাজাত দিয়ে শুরু হয় নতুন ব্যবসা।
আমার এক কনিষ্ঠ সহকর্মী সেই ব্যবসায়ীর খুব ঘনিষ্ঠ। সে একদিন তাঁকে জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইয়া, উনি আপনার কী হন?’
ভদ্রলোক উত্তর দিলেন—‘রক্তের কেউ না। একই গ্রামের লোক।’
সহকর্মী জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি তাঁকে এত সম্মান করেন কেন?’
‘চিনির দাম শোধ করি।’ ভদ্রলোক উত্তর দিলেন।
‘চিনির দাম শোধ করেন!’ বিস্মিত সহকর্মী বলল।
’হ্যাঁ, চিনির দাম শোধ করি। আমি খুব দরিদ্র ঘরের সন্তান। মানুষের ক্ষেতে বদলা খেটে পড়াশোনা করেছি। প্রায়ই দুপুরে বাড়িতে রান্না হতো না। এই চাচা গ্রামের হাটে ছোট একটি হোটেল চালাতেন। গরিবের হোটেল। বেড়া আর ছনের ছাউনি। ঝড়ে যেকোনো সময় উড়ে যাওয়ার অবস্থা। আমার খুব খিদা লাগলে ওখানে গিয়ে একটা শুকনা পরোটা কিনে খেতাম। উনি কয়েকদিন সেটা খেয়াল করার পর, পরোটা দেওয়ার সময় নিজে থেকে সেটিতে চিনি মাখিয়ে বলতেন—‘শুকনা পরোটা খাওয়া যায় নাকি? চিনি দিয়া খা। এরচেয়ে ভালো কিছু দোকানে নাইরে বাপ, থাকলে দিতাম। আমি খুব গরিব মানুষ। নয়ত পরোটার দামও নিতাম না।’
বলতে বলতে ব্যবসায়ী ভদ্রলোকের চোখ ভিজে উঠল। যেন তিনি দেখছেন, চল্লিশ বছর আগের নিজেকে। একজন বুভুক্ষ কিশোর। খিদায় যার শরীর কাঁপছে। তিনি ভেজা চোখ টিস্যু দিয়ে মুছলেন, তারপর বলেন—‘তীব্র ক্ষুধায় চিনি মেশানো পরোটাকে মনে হতো অমৃত। গরিবকে কেউ মায়া দেখায় না। লাথিগুতা মারে। কিন্তু এই চাচা আমাকে মায়া দেখিয়েছিলেন।’
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবলেন, তারপর বললেন—
‘আমি এখন সেই চিনির দাম শোধ করছি। কিন্তু মনে হয় তাঁর জন্য আমি যাই করি না কেন, সেই চিনির দাম কোনোদিন শোধ হবে না। মায়ার ঋণ শোধ হয় না রে, ছোটো ভাই।’
বলতে বলতে তিনি আবার টিস্যু টেনে নেন, তাতে লাভ হলো না। কিছু কিছু কান্না চিরস্থায়ী। টিস্যু পেপারের তা মোছার ক্ষমতা নেই।
– আসুন মায়া ছড়াই