হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্মাণাধীন তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পটিতে উন্নয়নকাজের নামে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় মেগা আর্থিক জালিয়াতি সংগঠিত হয়েছে। একটি গণমাধ্যমের দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, অসম্পূর্ণ এই বিমানবন্দর টার্মিনালটির সার্বিক বাজেট ধাপে ধাপে বাড়িয়ে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আট হাজার ৪৪১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও এই লুটপাটের ধারাবাহিকতায় কোনো ছেদ পড়েনি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের মেয়াদেও রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের এই অবিরাম ধারা অব্যাহত থেকেছে। আমলা, বিদেশি ঠিকাদার, স্থানীয় রাজনীতিক ও প্রভাবশালীদের একটি সিন্ডিকেট ভুয়া বিল প্রস্তুত, পণ্যের অযৌক্তিক দর বৃদ্ধি এবং সরকারি ক্রয়নীতি লঙ্ঘন করে আন্তর্জাতিক ঋণের একটি বিশাল অংশ আত্মসাৎ করেছে।
সংগৃহীত প্রায় ছয় হাজার পৃষ্ঠার চুক্তিপত্র, অডিট রিপোর্ট এবং অভ্যন্তরীণ নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে যখন প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন পায়, তখন এর মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে বারবার সংশোধনের নামে এই মূল ব্যয় বাড়িয়ে ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। মূল প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো এই সাত হাজার কোটি টাকার পুরোটাই সিন্ডিকেটের পকেটে গেছে। এর সিংহভাগ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে জাপানি ও দক্ষিণ কোরীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কনসোর্টিয়াম, যাদেরকে বেআইনিভাবে প্রায় ছয় হাজার ১০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা দেশি-বিদেশি চক্রকে এই বিপুল সরকারি অর্থ তুলে দিতে সরাসরি সহায়তা করেছেন।
প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের ধরনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগে থেকে কোনো উপযুক্ত সমীক্ষা বা পরীক্ষা ছাড়াই নকশায় বিতর্কিত প্রবিধান যুক্ত করা হতো। পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তিগত ত্রুটির অযুহাত দেখিয়ে নতুন নকশা ও অতিরিক্ত ভেরিয়েশন অর্ডারের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার বাড়তি কাজের সুযোগ তৈরি করা হয়। মোট ৬৭৩টি ভেরিয়েশন অর্ডারের মাধ্যমে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত কাজ দেওয়া হলেও, মাত্র ৫০ কোটি টাকার একটি অনুমোদন ছাড়া কোনো কাজই সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমতি নেয়নি। নিয়ম অনুযায়ী যেকোনো বড় পরিবর্তনের জন্য মন্ত্রিসভা কমিটির পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক হলেও, পরবর্তীতে সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবনার (আরডিপিপি) দোহাই দিয়ে এই মারাত্মক বেআইনি কর্মকাণ্ডগুলোকে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটিতে সরকারি নিরীক্ষায় ছয় হাজার ৩২৩ কোটি টাকার অনিয়ম পাওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত আরও দুই হাজার ১১৮ কোটি টাকার আর্থিক গাফিলতি ধরা পড়েছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ২৭টি সুনির্দিষ্ট খাতে ভুয়া বিল দেওয়া, ঠিকাদারদের অতিরিক্ত মুনাফা প্রদান, আনফিট দর নির্ধারণ এবং বাজারদরের চেয়ে কম দামের দেশীয় পণ্য সরবরাহ করে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের মূল্য আদায়ের প্রমাণ পেয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, বেবিচকের কতিপয় কর্মকর্তা সময়ক্ষেপণ করে এমনভাবে আইনি প্রক্রিয়া স্থগিত রেখেছিলেন, যাতে নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হয়ে যায় এবং অতিরিক্ত দেওয়া ছয় হাজার ১০০ কোটি টাকা আর জাপানি ঠিকাদারদের কাছ থেকে আইনগতভাবে উদ্ধার করা না যায়।
প্রকল্পের কারিগরি ও প্রশাসনিক তদারকির দায়িত্বে থাকা বুয়েটের বিআরটিসি এবং আন্তর্জাতিক পরামর্শক গোষ্ঠী এই জালিয়াতি রুখে দেওয়ার বদলে উল্টো নজিরবিহীন নীরবতা ও সমর্থনের মাধ্যমে লুটপাট আড়াল করেছে। পরিকল্পনা কমিশন থেকে আপত্তি তোলা হলে বুয়েটের একজন শীর্ষ প্রতিনিধি কোনো উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই চিঠির মাধ্যমে এই অতিরিক্ত ব্যয়কে প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা দেন, যা চূড়ান্ত বিল ছাড়ের পথ উন্মুক্ত করে দেয়। সরকারি অডিট আপত্তি অমীমাংসিত থাকা এবং হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের কোনো সুরাহা না হওয়া সত্ত্বেও সম্প্রতি এই প্রকল্পের জন্য নতুন করে অতিরিক্ত বরাদ্দের অনুমোদন প্রসেস করা হচ্ছে।
টিআইবিসহ সুশাসন বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনাকে রাজনীতি, আমলাতন্ত্র ও ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের এক মারাত্মক অপরাধমূলক আঁতাত বলে আখ্যা দিয়েছেন। জাপানি সাহায্য সংস্থা জাইকার ঋণে বাস্তবায়িত এই মেগা প্রকল্পের আর্থিক দায় এখন চূড়ান্ত বিচারে দেশের সাধারণ করদাতাদেরই বহন করতে হবে। চুক্তি অনুসারে ২০২৪ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অতিরিক্ত ব্যয় বাড়িয়েও এখনও অব্যাবহৃত পড়ে আছে বিমানবন্দরটির এই টার্মিনাল। যে গতিতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা চলেছে, তাতে নতুন করে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে আংশিক চালুর যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা নিয়ে খোদ বেবিচকের ভেতরেই তীব্র সংশয় দেখা দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ