বিদেশের শ্রমবাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর হওয়ায় চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স খাত ও প্রবাসী কর্মীরা। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাহত হচ্ছে বিমান চলাচল, আটকে পড়েছেন ছুটিতে আসা হাজারো প্রবাসী এবং থমকে গেছে নতুন কর্মীদের বিদেশযাত্রা। একই সঙ্গে বাড়ছে অবৈধপথে মানব পাচারের ঝুঁকি।
ফ্লাইট বাতিল, আটকে পড়া কর্মীদের হাহাকার
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ইরান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান তাদের আকাশসীমা বন্ধ রাখায় ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গত ১২ দিনে ৩৯১টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
দেশে ছুটিতে এসে আটকে পড়েছেন অনেক প্রবাসী। ওমানপ্রবাসী মোবারক হোসেন বা ফরহাদ হোসাইনের মতো অনেকেই কোম্পানির তাগিদ থাকা সত্ত্বেও ফ্লাইটের অভাবে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না।
যারা ঋণ করে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তারা এখন চরম আর্থিক ও মানসিক চাপে পড়েছেন।
বিদেশে কর্মী যাওয়ায় ভয়াবহ ধস
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রভাবে মার্চ মাসের প্রথম ১০ দিনে বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র নেওয়ার হার গত বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। গত বছর এই সময়ে ৪৬,৭৪৪ জন ছাড়পত্র নিলেও এবার নিয়েছেন মাত্র ২১,১২২ জন। আতঙ্ক ও ফ্লাইট সংকটের কারণেই এই ধস নেমেছে।
অতিমাত্রায় মধ্যপ্রাচ্য-নির্ভরতার খেসারত
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি না করে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণেই আজ এই বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মীর মধ্যে ৬৭ শতাংশই গেছেন শুধু সৌদি আরবে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ। দক্ষ কর্মীর অভাবে ইউরোপ বা জাপানের মতো সম্ভাবনাময় বাজারেও আশানুরূপ কর্মী পাঠানো যাচ্ছে না।
হতাহত ও সরকারি উদ্যোগ
চলমান এই যুদ্ধে ইতিমধ্যে সৌদি আরবে দুজন এবং বাহরাইন ও আরব আমিরাতে একজন করে মোট চারজন প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের জন্য হটলাইন ও কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।
সরকারের অনুরোধে কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও আরব আমিরাত আটকে পড়া কর্মীদের ভিসার মেয়াদ ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। ফিরে আসা প্রবাসীদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি জাপান, ইউরোপসহ এশিয়ার নতুন বাজারগুলোতে দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর জোর দিচ্ছে সরকার।
অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচারের নতুন ফাঁদ
নিয়মিত অভিবাসন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মানব পাচারকারীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে সতর্ক করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরু।
রাশিয়ার ফাঁদ: ভালো বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে একটি চক্র বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় নিয়ে যাচ্ছে এবং অবৈধভাবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ফ্রন্টলাইনে পাঠাচ্ছে।
সমুদ্রপথে ইতালি: এ বছর সমুদ্রপথে লিবিয়া হয়ে ইতালিতে পৌঁছানো অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা শীর্ষে রয়েছেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধাক্রান্ত দেশগুলোর বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার এবং সাধারণ মানুষকে দালালদের প্রলোভন থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।