মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি খাতে। হরমুজ প্রণালী ঘিরে সৃষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো পণ্য পরিবহনের বুকিং সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। এছাড়া, জাহাজ ভাড়া ও বিমা খরচ পুষিয়ে নিতে কনটেইনারপ্রতি মোটা অঙ্কের ‘যুদ্ধ-ঝুঁকি সারচার্জ’ আরোপ করায় বেড়ে গেছে সামগ্রিক বাণিজ্য খরচ।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের বুকিং বন্ধ রেখেছে বেশিরভাগ শিপিং লাইন। বর্তমানে প্রায় ১৪০টি কনটেইনারবাহী জাহাজ সমুদ্রপথে আটকা পড়েছে, যার মধ্যে অনেক জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য নির্ধারিত পণ্য বহন করছে। এর ফলে একদিকে যেমন কাঁচামাল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটছে, অন্যদিকে রপ্তানিকারকরা তাদের প্রস্তুতকৃত পণ্য গন্তব্যে পাঠাতে না পেরে চরম লোকসানে পড়েছেন।
চট্টগ্রাম সবজি ও ফলমূল রপ্তানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ফোরকান রুবেল বলেন, “ঈদের আগে মধ্যপ্রাচ্যে পোশাক, টুপি, শুকনো খাবার ও সবজির বড় চাহিদা থাকে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক পণ্য এখন ফ্যাক্টরিতেই আটকে আছে, যা আমাদের বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।”
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো বাড়তি খরচের দায়ভার ব্যবসায়ীদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। মার্স্ক লাইন, এমএসসি (MSC), সিএমএ-সিজিএম ও হ্যাপাগ-লয়েডের মতো শীর্ষ শিপিং লাইনগুলো কনটেইনারপ্রতি ৮০০ থেকে ২০০০ ডলার পর্যন্ত ‘ইমার্জেন্সি কনফ্লিক্ট সারচার্জ’ আরোপ করেছে। হিমায়িত পণ্যবাহী ‘রেফার’ কনটেইনারের ক্ষেত্রে এই সারচার্জ প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ ফ্রেইটফরওয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহ-সভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, “শিপিং কোম্পানিগুলো এখন অত্যন্ত সতর্ক। যেসব কনটেইনার ইতোমধ্যে জাহাজে বা বন্দরে রয়েছে, সেগুলোতেও এই বাড়তি চার্জ প্রযোজ্য হচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি প্রতিযোগিতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতি বছর প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেল ও এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পকারখানায় জ্বালানি সংকটের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকারি উদ্যোগে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কেনার প্রক্রিয়া শুরু হলেও, সংঘাত দীর্ঘমেয়াদী হলে জ্বালানি ও সারের দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
সারসংক্ষেপ:
সারচার্জ: কনটেইনারপ্রতি ৮০০ থেকে ২০০০ ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত মাশুল।
বুকিং অবস্থা: মধ্যপ্রাচ্যগামী অধিকাংশ রুটে নতুন বুকিং সাময়িকভাবে বন্ধ।
প্রভাব: রপ্তানি পণ্য আটকা পড়া, আমদানিকৃত কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং শিল্প উৎপাদনে অনিশ্চয়তা।
সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য বিকল্প সরবরাহ পথ ব্যবহারের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছে। তবে বর্তমান অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে জরুরি বৈঠকের দাবি জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।